অর্থকাগজ প্রতিবেদন>

স্বল্প সুদে সবুজ অর্থায়ন বা গ্রিন ফাইন্যান্স মিললে দেশের আরও ১ হাজার ৩০০টি তৈরি পোশাক কারখানা রুফটপ সোলারে (ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ) বিনিয়োগ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রমবর্ধমান সবুজ শর্ত পূরণ এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এই রূপান্তর এখন পোশাক খাতের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এবং বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য শক্তি ফোরাম আয়োজিত ‘পোশাক খাতের শিল্প কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল গবেষণা উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আবরার আহমেদ ভূঁইয়া ও প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট নুর ইয়ানা জান্নাত।

অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বললেন, তৈরি পোশাক খাত ধীরে ধীরে রুফটপ সোলারের দিকে ঝুঁকছে, যা জাতীয় জ্বালানি খাতের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশের ডিকার্বনাইজেশন হ্রাসের লক্ষ্যপূরণে বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে প্রায় ৫০০টি পোশাক কারখানা নিজস্ব অর্থায়নে সোলারে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে ঋণের শর্ত সহজ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদের হার সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে আরও ১ হাজার ৩০০ কারখানাকে এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। অন্যদিকে, ৪০০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বা ছোট কারখানার ক্ষেত্রে সরকারি ও নীতিগত বড় ধরনের সহায়তা বা ইন্টারভেনশন প্রয়োজন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উপগ্রহের ভৌগোলিক উপাত্ত ব্যবহার করে দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ওপর চালানো গবেষণায় দেখা যায়, এসব কারখানায় কার্যকর ছাদ রয়েছে মোট ৯৭ দশমিক ২৫ লাখ বর্গমিটার। এসব ছাদ সোলার প্যানেল স্থাপনে ব্যবহার করা গেলে ১ হাজার ৭৬৮ দশমিক ৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারে।

কারখানার আকারভেদ বিশ্লেষণে বলা হয়, ২ হাজার ৪২০টি ছোট কারখানা থেকে ৪৮৪ দশমিক ৭ মেগাওয়াট, ৬৯৮টি মাঝারি কারখানা থেকে ৬৩৭ মেগাওয়াট এবং ২০১টি বড় কারখানা থেকে ৬৪৬ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলতে পারে। বর্তমানে যেসব কারখানায় সোলার নেই, এমন ২ হাজার ৩০৩টি কারখানায় প্যানেল বসাতে ১৮৮ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা) বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, বর্তমানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় মাত্র ৩ দশমিক ০৪ টাকা, যা জাতীয় গ্রিড থেকে কেনা বিদ্যুতের মূল্যের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। সোলার প্যানেল বসালে প্রতিটি কারখানা তার বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার ৩৩-৪০ শতাংশ পর্যন্ত নিজস্ব পরিবেশবান্ধব উৎস থেকে মেটাতে পারবে। বর্তমানে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি কারখানার ওপর সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত বিদ্যুতের মাত্র ৩ শতাংশ আসছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে; অথচ সঠিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।

ব্যবসায়িক বাস্তবতার উদাহরণ দিয়ে অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ‘আমাদের বিভিন্ন কারখানায় এরই মধ্যে ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে আমাদের কালিয়াকৈর ও কালীগঞ্জের ইউনিটগুলো সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুতে চলে এবং ডিজেলের ব্যবহার প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে কমার্শিয়াল ব্যাংকের সুদের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশের ওপরে উঠে যাওয়ায় এ ধরনের সোলার প্রকল্পগুলো ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আর লাভজনক থাকছে না। এ ছাড়া ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের কঠিন শর্ত ও জামানত জটিলতা, শ্রেডা থেকে সরঞ্জাম অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, ডলার সংকটে এলসি খুলতে বিলম্ব, উচ্চ শুল্কহার এবং ক্রেতাদের আকাশপথে উদ্ধার অভিযানের অজুহাতে ছাদের ২০ শতাংশ জায়গা খালি রাখার অযৌক্তিক শর্ত সোলার বিস্তারে বড় বাধা।

Leave A Reply

Exit mobile version