অর্থকাগজ প্রতিবেদন

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। এতে আগের সব রেকর্ড ভেঙে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণসংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ হয়েছে দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

গত জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণ ছিল দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ওই সময় দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ খেলাপি ছিল। গত মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল এক লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি এবং ডিসেম্বরে ছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ দুই হাজার ৬৮২ এবং ৯ মাসে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর এই প্রথম খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে, ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের হতে শুরু করেছে। সাবেক সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে প্রভাবশালীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে নানা সুবিধা দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কম দেখাতে নেয়া হয়েছিল একের পর এক নীতি। সরকার পরিবর্তনের পর সেই নীতি থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বাড়াতে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এই সময়ে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৬ হাজার ১১২ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৪০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ৪৯ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪৯ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে তিন হাজার ২৪৫ কোটি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের পাঁচ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা হয়েছে।

বিশেষ করে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়া ব্যাংকগুলো ঋণের প্রকৃত চিত্র দেখাতে শুরু করেছে। এগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। একইভাবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বেশ অনেকটা বেড়েছে। পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, এস আলমসহ আরও কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এতেও বেড়েছে খেলাপি ঋণ।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবশ্য মনে করেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হিসাবে অবলোপন করা ও আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ বিবেচনায় নেয়া হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাত সংস্কারে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আগামী দিনে আরও বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা বলেন, ‘এই প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। আগে মেয়াদি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ছয় মাসে ছিল, তা এখন তিন মাস করা হয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা হওয়ায় ঋণ পরিশোধ কম হচ্ছে। এই কারণেও খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। খেলাপি ঋণ কমাতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধে আগ্রহী হয় সেই ধরণের ব্যবস্থার কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভাবছে।’
অকা/ব্যাংখা/ই/ সকাল, ১৮ নভেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

Leave A Reply

Exit mobile version