অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও ব্যয়বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় কারখানাগুলো ক্রমেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। গ্যাস সংকট, গ্রিড বিদ্যুতের ঘনঘন বিভ্রাট এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি বাড়ায় শিল্প উদ্যোক্তারা বিকল্প ও স্থিতিশীল সমাধান খুঁজছেন। এর ফলেই শিল্পখাতে রুফটপ সোলারের স্থাপিত সক্ষমতা ইতোমধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।

দেশের শীর্ষ কম্পোজিট পোশাক প্রস্তুতকারক রাইজিং গ্রুপ দুই বছর আগেও সমানভাবে জাতীয় গ্রিড ও নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌর স্থাপনা থেকে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ পূরণ করছে। এতে করে গ্যাস সংকটের সময় ক্যাপটিভ উৎপাদনের চাপ কমানো সম্ভব হয়েছে।

একইভাবে প্যাসিফিক জিন্স চার বছর আগে ৭ মেগাওয়াটের রুফটপ সোলার স্থাপন করে, যা এখন তাদের বিদ্যুতের প্রায় ১২ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর জানান, সৌরবিদ্যুৎ তাদের জ্বালানি ব্যয় স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।

শিল্পখাতে এই প্রবণতা কেবল ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য নয়; বৈশ্বিক সবুজ মানদণ্ড মেনে চলার প্রয়োজনীয়তাও এর বড় কারণ। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা এখন সরবরাহকারীদের কার্বন নির্গমন কমাতে চাপ দিচ্ছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

ডিবিএল গ্রুপ ইতোমধ্যে ৫.৪ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌর সক্ষমতা স্থাপন করেছে এবং চলতি বছরে আরও ১.৫ মেগাওয়াট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন কেবল পরিবেশগত দায় নয়, বরং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল।”

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রুফটপ সোলারের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দুই বছর আগে যেখানে ১ মেগাওয়াট স্থাপনে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হতো, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটিতে। দীর্ঘমেয়াদে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ ৩.৫ টাকার নিচে পড়ে, যেখানে গ্রিড বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রায় ৯.৭ টাকা। ফলে সাধারণত চার বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া যায়।

২০১৮ সালে নেট মিটারিং নীতিমালা চালুর পর শিল্পখাতে সৌরবিদ্যুতের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এই ব্যবস্থায় অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বিল সমন্বয়ের সুযোগ পাওয়া যায়। পরে অনুমোদিত লোডের ৭০ শতাংশ সীমা তুলে দেওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী বড় পরিসরে স্থাপনা করতে পারছে।

বর্তমানে ইয়ংওয়ান গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, বিএসআরএম, জিপিএইচ ইস্পাত, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজসহ বহু প্রতিষ্ঠান রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে। বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানি শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং চলতি বছর আরও কয়েকশ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো—রুফটপ সোলার পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে পারে না। সাধারণত এটি ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা উৎপাদন সচল রাখতে পারে এবং মোট চাহিদার ১৫-২০ শতাংশ সরবরাহ করে। বিশেষ করে ডাইং, ওয়াশিং বা স্পিনিংয়ের মতো উচ্চ বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পে এই হার আরও কম।

তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি—দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানিতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সে প্রেক্ষাপটে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের জন্য আংশিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদ রয়েছে। শুধু বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড-নির্ভর কারখানাগুলোর জন্যই কয়েক হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিদ্যমান ছাদের জায়গা ব্যবহার করে সর্বোচ্চ প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব—অর্থাৎ সম্ভাবনা থাকলেও তা সীমাবদ্ধ।

সব মিলিয়ে, শিল্পখাতে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ এখন কেবল পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকারি নীতি সহায়তা ও অবকাঠামোগত সমর্থন বাড়লে এই খাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।

অকা/জ্বা/ই/সকাল/৩১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version