অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
রেকর্ড রেমিট্যান্স সত্ত্বেও বাণিজ্য ঘাটতিতে চলতি হিসাবে চাপ; স্বস্তি দিচ্ছে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও দেশের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের (Current Account) ঘাটতি আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্টস’ (বিওপি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং নামমাত্র রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ফলে সৃষ্টি হওয়া বিশাল বাণিজ্য ঘাটতিই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
চলতি হিসাব ও বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র:
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৯৬ মিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৬৮ মিলিয়ন ডলার। এই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা বাণিজ্য ঘাটতি সামাল দিতে অপর্যাপ্ত ছিল। আলোচ্য সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি ১৮.৫২ শতাংশ বেড়ে ৯.৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যেখানে আমদানি ৬.১০ শতাংশ বেড়ে ২৭.৬০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, সেখানে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ০.৬০ শতাংশ (১৮.১৯ বিলিয়ন ডলার)।
আমদানি বৃদ্ধির নেপথ্যে:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিল্প ও কৃষি খাতের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে:
অপরিদোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি ৩৭% এবং পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের আমদানি ১৪% বেড়েছে।
সারের আমদানি গত বছরের ৯৬০ মিলিয়ন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১.৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
শিল্পের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতির (Capital Machinery) আমদানি বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
আর্থিক হিসাব ও সামগ্রিক ভারসাম্যে ইতিবাচক ধারা:
চলতি হিসাবে চাপ থাকলেও বাংলাদেশের 'আর্থিক হিসাব' (Financial Account) বড় ধরনের উন্নতি দেখিয়েছে। গত বছরের ১.০১ বিলিয়ন ডলার ঘাটতির বিপরীতে এবার ১.২৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রেকর্ড করা হয়েছে। মূলত বিদেশি সহায়তার নিট প্রবাহ ৮৭% বৃদ্ধি এবং ট্রেড ক্রেডিট বা বাণিজ্যিক ঋণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসায় এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য (Overall Balance) ৭৬৯ মিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে রয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ২.৫৪ বিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে ছিল।
বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ:
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আমদানি বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও রফতানি প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের নিচে নেমে আসা উদ্বেগজনক। তিনি উল্লেখ করেন, "আর্থিক হিসাব উদ্বৃত্ত হওয়া এবং সামগ্রিক বিওপি পজিটিভ থাকা বাহ্যিক অর্থায়নের সক্ষমতা নির্দেশ করে। তবে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ কমে যাওয়া বিনিয়োগ স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য রফতানি আয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং বিদেশি সহায়তা প্রবাহ অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিলেও বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে উৎপাদনশীল খাতের রফতানি সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/১৪ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

