অর্থকাগজ প্রতিবেদন>
পণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় বন্ধে সরকার প্রতিটি পণ্যের সাপ্লাই চেইনে প্রাতিষ্ঠানিক ‘ট্রেসেবিলিটি’ বা ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ‘খাদ্য পণ্যের মূল্য চেইন: বাংলাদেশে বাজার, মার্জিন এবং মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী এ কথা জানান।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘‘অনেকে বাজারে পণ্য পরিবহনে সরাসরি ‘চাঁদাবাজি’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। তবে আমি একে একটু পরিমার্জিত রূপ দিয়ে বলছি— আমাদের ‘আনঅ্যাকাউন্টেড ফর এক্সপেন্স’ খরচ কমাতে হবে। এই কমানোর লাইনগুলি ধরার জন্য আমরা অনেকগুলি আইটেমের উপরে ট্রেসেবিলিটি (উৎস ট্র্যাকিং) করতে যাচ্ছি, একটা ফর্মাল ট্রেসেবিলিটি। এই ট্রেসেবিলিটিগুলি যদি আমরা করে ফেলতে পারি, তাহলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই স্কোপটা আমরা আইডেন্টিফাই করতে পারব যে কোন জায়গায় এই জিনিসটা হচ্ছে।’
বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত লজিস্টিক কস্ট বা পণ্য পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়— উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘সারা বিশ্বে গড়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয় হিসেবে ধরা হয়, যা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড। কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ১৬ শতাংশে। অবকাঠামোগত জটিলতা, তথ্যের সুনির্দিষ্ট আদান-প্রদান না থাকা এবং রাস্তায় জায়গায় জায়গায় হিসাববহির্ভূত খরচের কারণেই পণ্যের দাম ভোক্তা পর্যায়ে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়।’
বাজারের বৈষম্য ও তথ্যের ঘাটতি বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেছেন, আলু উৎপাদনের হার দেশে বার্ষিক ১ কোটি টন ছাড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এবং চাহিদা অপেক্ষা উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও কৃষক সঠিক দাম পাচ্ছেন না। কৃষকের কাছে বাজারের সঠিক তথ্য বা ইনপুট না থাকায় এবং বাজারজাতকরণের সঠিক ব্যবস্থার অভাবে মধ্যস্বত্বভোগী ও হিসাববহির্ভূত খরচের চাপ তৈরি হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির। তিনি বলেছেন, দেশে বর্তমানে সাধারণ মানুষের ওপর উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির ব্যাপক চাপ রয়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি ও শেষের দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
দেশের দরিদ্রতম ৫ শতাংশ পরিবার তাদের আয়ের প্রায় ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে, যেখানে জাতীয় গড় হলো ৪৫ দশমিক ৮। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে এই নিম্নবিত্ত মানুষরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নামমাত্র মজুরি বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
প্রতিবেদনে ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দেশীয় খাদ্যপণ্য চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম, রুই মাছ, গরুর মাংস ও মুরগি) সরবরাহ চেইন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ৬টি পণ্যের (পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম এবং রুই মাছ) ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা প্রধান সংগ্রহের উৎস হিসেবে কাজ করে, যা বাজারে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করে। সরবরাহ চেইন যত লম্বা হয়, খামার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম তত বেশি বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কাঁচামরিচের ক্ষেত্রে দাম প্রায় ১১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে উচ্চ মূল্যের পেছনে সরবরাহকারীর ঘাটতির পাশাপাশি আরও কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো— বাজারে মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের প্রভাব, মধ্যস্বত্বভোগী বা কমিশন এজেন্টদের আধিপত্য, অপর্যাপ্ত স্টোরেজ এবং পরিবহন সুবিধা ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি।প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য সরবরাহ চেইন সচল করা, বাজার মনিটরিং, তথ্য স্বচ্ছতা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদন খরচ কমানোর কথা বলা হয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 49 minutes আগে

