অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশে ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে ৭ জুন। আর ঈদ উপলক্ষে প্রবাসীরা সবসময়ই বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। তবে এবার জুনের প্রথম তিনদিনে যে পরিমাণ প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, সেটি অতীতে দেখা যায়নি। ৪ জুনও ব্যাংক খোলা ছিল। ওই দিনও প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। ৫ জুন থেকে টানা ১০ দিন সরকারি ছুটি। আশা করছি, ছুটির পরও প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো অব্যাহত রাখবেন।’
রেমিট্যান্সের এ উল্লম্ফনের মধ্যেই শুরু হয়েছে টানা ১০ দিনের সরকারি ছুটি। দীর্ঘ এ বন্ধের কারণে ব্যাংক খাতে অর্থ পাঠাতে না পেরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা অবৈধ হুন্ডিকে বেছে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। থমকে যেতে পারে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের উল্লম্ফন। হোঁচট খেতে পারে প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান তথা গত বছরের ৫ আগস্ট থেকেই দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে চলছে বড় প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশে এসেছে ২ হাজার ৭৫১ কোটি বা ২৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয়। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে)। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ২১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরে ১১ মাসে প্রবাসীরা ৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার বেশি পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
রেমিট্যান্সের বড় প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত ছিল মে মাসেও। প্রবাসী বাংলাদেশীরা মাসে ২৯৭ কোটি বা ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন। ২০২৪ সালের মে মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ। মে মাসের পর চলতি জুনের প্রথম তিনদিনেই ৬০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। গত বছরের জুনের প্রথম তিনদিনে যেখানে এসেছিল মাত্র ২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এ তিনদিনে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ১১১ শতাংশেরও বেশি ছিল বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ছুটি শুরুর আগের দিন তথা ৪ জুনও দেশে প্রায় ২২ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। ঈদের আগে অন্তত আরো একদিন ব্যাংক খোলা থাকলে প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি উপকৃত হতো। যেসব প্রবাসী ৪ জুনের মধ্যে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেননি, তারা পরিবারের প্রয়োজনে হুন্ডিকেই বেছে নিতে পারেন। ফলে আবারো জমজমাট হয়ে উঠতে পারে সংকুচিত হয়ে আসা অবৈধ এ তৎপরতা।
ব্যাংক বন্ধ থাকায় হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া বাংলাদেশীদের একজন সৌদি আরবের জেদ্দায় বসবাসকারী ইকবাল হোসেন। বলেন, ‘বেতন বোনাস পেয়েছি ৫ জুন। এখন দেশে কোরবানির পশু কেনার জন্য টাকা পাঠাতে হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাংক বন্ধ। এ কারণে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর চেষ্টা করছি। স্বাভাবিক সময়ে আমি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বৈধ চ্যানেলেই টাকা পাঠাই।’
প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে ১৫ জুনের আগে তোলা যাবে না। কিন্তু পরিবারের জরুরি ভিত্তিতে টাকা প্রয়োজন। এজন্য হুন্ডির মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছি। স্ত্রীর মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে ৫ মিনিটের মধ্যেই সে টাকা চলে গেছে।’
ঈদের আগে আরো একদিন ব্যাংক খোলা থাকলে রেমিট্যান্সের জন্য ভালো হতো বলে মনে করেন মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। বর্তমানে দেশে রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে মার্কিন এ মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান। বণিক বার্তাকে সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘প্রবাসীরা ৪ জুন পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠানোর সময় পেয়েছেন। এ সময়ে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, সেটি সন্তোষজনক। তবে ঈদের আগে যদি আরো একদিন ব্যাংক খোলা থাকত, তাহলে প্রবাসী পরিবারের উপকার হতো। ছুটি শেষে ১৫ জুন ব্যাংক খুলবে। সরকারি ছুটি থাকলে ব্যাংকের নস্ট্রো (ব্যাংকের আন্তর্জাতিক লেনদেনের হিসাব) হিসাবের লেনদেনও বন্ধ থাকে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে চলতি অর্থ বছরে। ৩ জুন পর্যন্ত এসেছে ২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। এর আগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২০-২১ অর্থ বছরে। করোনাভাইরাসে সৃষ্ট দুর্যোগের ওই বছরে প্রবাসীরা ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসেছিল ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ও ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা বেড়ে ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থ বছরে ২৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
হুন্ডির তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে দেশে প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসবে বলে মনে করেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাসে গড়ে ২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। হুন্ডির তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এটি ৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যসহ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এটি আরো বাড়ানো সম্ভব হলে রিজার্ভ সমৃদ্ধ হবে, ডলার সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে। ●
অকা/আখা/ফর/রাত/৬ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

