অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পতনের মাত্রা আতঙ্কজনক না হলেও দেশের পুঁজি বাজার টানা ছয়টি কর্মদিবস পার করেছে সূচকের অবনতি দিয়ে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বাজারে সূচকের যে পরিমাণ উন্নতি ঘটেছে ছয় দিনে সূচকের অবনতি সে তুলনায় খুব বেশি নয়। তবুও ছয় দিনের এ পতন বিনিয়োগকারীদের কিছুটা হলেও হতাশ করেছে। প্রতিদিনই লেনদেনের শুরুতে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও দিনশেষে তা ধরে রাখতে পারছে না দেশের দুই পুঁজি বাজার। শেষ মুহূর্তে এসে বিক্রয়চাপে পতন ঘটছে সূচকের।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১২ আগস্ট ২৮ দশমিক ৬০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৩৪৪ দশমিক ০৪ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৩১৫ দশমিক ৪৪ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর অন্য দু’টি সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৭২ ও ৯ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট। এ দিন দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ৮৪ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট হ্রাস পায়। একই সময় বাজারটির অন্য দু’টি সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৬২ দশমিক ৮২ ও ৫৩ দশমিক ১৫ পয়েন্ট।

সূচকের অবনতি ঘটলেও ১২ আগস্ট দুই পুঁজি বাজারেই লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ঢাকা শেয়ার বাজারে ৬৬৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ৬০ কোটি টাকা বেশি। ১১ আগস্ট ডিএসইর লেনদেন ছিল ৬০৬ কোটি টাকা। অপর দিকে, চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারের লেনদেন আগের দিনের ১২ কোটি টাকা থেকে ২২ কোটি টাকা হয়েছে।

মার্জিন ঋণের গুজব- এ দিকে পুঁজি বাজারে মার্জিন ঋণ নিয়ে নতুন কিছু গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রোকার হাউজগুলোতে কে বা কারা গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে যে, মার্জিন ঋণের নতুন নীতিমালা হয়েছে। সেখানে একটি কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয়ের পাশাপাশি শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) বিবেচনায় নিয়ে ঋণের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত এ গুজব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্ত্রি ছড়াচ্ছে, বাড়াচ্ছে উদ্বেগ। আর এর ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। গত পাঁচ দিনের দর পতনের পেছনে মূল্য সংশোধন প্রবণতার পাশাপাশি এই গুজবেরও বড় ভূমিকা ছিল বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সূত্রে জানা গেছে, নতুন করে তারা মার্জিন ঋণের কোনো নীতিমালা তৈরি করেনি। আর এনএভির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঋণের হার নির্ধারণ করার মতো কোনো বাস্তবতা এ মুহূর্তে বাংলাদেশে নেই। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এ মুহূর্তে এ জাতীয় কোনো উদ্যোগ নেয়ার প্রশ্নই আসে না।

প্রসঙ্গত, মার্জিন ঋণ হচ্ছে পুঁজি বাজারে শেয়ার কেনার জন্য বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া বিশেষ ঋণ সুবিধা। মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার হাউজগুলো তাদের গ্রাহকদেরকে এ ঋণ দিয়ে থাকে। কোনো কারণে বাজারে গ্রাহকের শেয়ারের দাম কমে গেলে ঋণ অনুপাত নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যেতে পারে। এমন অবস্থায় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীকে ঋণ সমন্বয়ের জন্য নতুন করে টাকা জমা দেয়ার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেয়। একে বলা হয় মার্জিন কল। মার্জিন কল পাওয়ার পরও বিনিয়োগকারী ঋণ সমন্বয় করতে ব্যর্থ হলে ঋণদাতা ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংক বিনিয়োগকারীর শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারেন। একে বলা হয় ফোর্সড সেল।

বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় না বুঝে এবং নিজের সমতার চেয়ে বেশি মার্জিন ঋণ নেয়ার কারণে ব্যাপকভাবে তিগ্রস্ত হন। বিশেষ করে পড়ন্ত বাজারে এটি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে সর্বস্বান্ত করে দেয়। অতীতে মার্জিন ঋণের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে গ্রাহকের পাশাপাশি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানও তিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানামুখী আলোচনা হয়েছে।

গত বছরের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর উল্লিখিত বিষয়সমূহ বিবেচনায় নিয়ে পুঁজি বাজার সংস্কারে গঠিত টাস্কফোর্স চলতি বছরের শুরুর দিকে বিএসইসির কাছে বেশ কিছু সুপারিশ জমা দিয়েছে। সেখানে মার্জিন ঋণের বিষয়ও রয়েছে। এতে ১০ লাখ টাকার কম বিনিয়োগ রয়েছে, এমন বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ না দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব বিনিয়োগকারীর নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস নেই, তাদের জন্যও ঋণসুবিধা বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া অবসরে থাকা বিনিয়োগকারী, গৃহিণী ও শিার্থীদেরও ঋণসুবিধার বাইরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বড় কারণ হচ্ছে, এসব বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি নেয়ার সমতা কম। নিজের শেয়ারের দাম কমে গেলে বা বাজারে মন্দা দেখা দিলে মার্জিন কলে সাড়া দিয়ে বাড়তি টাকা জমা দেয়া তাদের পে কঠিন। তাতে ফোর্সড সেলের খাড়ায় পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর বাইরে মার্জিন ঋণ নিয়ে নতুন করে আর কিছু নেই।

১২ আগস্ট ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন। ২৫ কোটি ৯০ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬ লাখ ৮২ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় ১২ আগস্ট। ১৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় ২৪ লাখ ৫ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্র্যাক ব্যাংক ছিল তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকায় আরো ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, লাভেলো আইসক্রিম, মালেক স্পিনিং, হাক্কানি পেপার অ্যান্ড পাল্প, সিটি ব্যাংক, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস ও বিচ হ্যাচারি। ●

অকা/পুঁবা/ফর/রাত /১২ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version