অর্থকাগজ প্রতিবেদন

জীবন বীমা ও সাধারন বীমা অর্থাৎ দেশের বীমা খাতের লাইফ এবং নন লাইফ বীমার ওপর ভিত্তি করে যে সরকারি নিয়ন্ত্রণকারি প্রতিষ্ঠান- বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রতিষ্ঠিত সে প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে সদস্য পদ দু’টি শূন্য। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে (আইডিআরএ) সদস্য (নন লাইফ) সাড়ে ৪ এবং সদস্য (লাইফ) পদ খালি ১ বছরের অধিক সময় ধরে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. এম. মোশাররফ হোসেন, এফসিএ ৩ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পান গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাকে ২০১৮ সালের ৪ মে সদস্য (লাইফ) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। আগের চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান পাটওয়ারীর ৩ বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ২২ আগস্ট। ২৬ আগস্ট থেকে ড. মোশাররফ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে আজ অবধি সদস্য (লাইফ) পদ পূরণ হয়নি।

গুরুত্বপূর্ণ এই দুই পদে কর্মকর্তা না থাকায় ৮১টি (৪৬টি নন লাইফ ও ৩৫টি লাইফ) বীমা কোম্পানিসহ প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম বেশ স্থবির হয়ে আছে। বীমা খাতের কাজে গতি পাচ্ছে না। ফাইলের সিদ্ধান্ত প্রায় সময়ই আটকে যাচ্ছে। সদস্য পদ দু’টির নিচের কর্মকর্তারা বিশাল খাতের সঠিক পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ প্রেষণে নিয়োজিত যুগ্ম সচিব ও উপ সচিব পর্যায়ের নির্বাহী পরিচালক এবং পরিচালকদের ওপর কাজের চাপ বাড়ছে। ফলে দাফতরিক কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। বহু বীমা প্রতিষ্ঠানে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে স্থায়ী কর্মকর্তা নেই। ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে দিনের পর দিন। প্রধান নির্বাহী পদে চলতি দায়িত্বে এসব কর্মকর্তা কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। সময়ের যোগ্যতাপ্রাপ্ত অনেক কোম্পানি পুঁজি বাজারের গণ প্রস্তাবে (আইপিও) আসছে না। ফি বছর জরিমানা দিয়ে চলছে কোম্পানিগুলো। ২০ বছরের অধিক সময় ধরে গণ প্রস্তাবে আসতে ব্যর্থ এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও একাধিক। এছাড়াও প্রতিষ্ঠান ও নির্বাহী কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা এবং অনিয়মে নিয়ন্ত্রণকারি প্রতিষ্ঠান উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আার্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা অর্থকাগজকে বলেন, আমরা জানি, জীবন ও সাধারন বীমা নিয়ে প্রধানত বীমা খাতের পরিচয়। সে বিবেচনায় বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারি প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে (আইডিআরএ) ২টি পদ শূন্য অনেক দিন। আমরা বসে নেই। ব্যক্তিগত উদ্যেগে বীমা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ২টি সদস্য পদে ২ জন প্রার্থীর নাম মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে অযোগ্য বিবেচনায় তাদের নিয়োগ প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। অতি সম্প্রতি সদস্য পদ ২টিতে নিয়োগের ব্যাপারে একটি সার সংক্ষেপ মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে পেশ করা হয়েছে। প্রস্তাব পত্রে বলা হয়েছে সদস্য নিয়োগের জন্য দেশের ২টি বাংলা ও ১টি ইংরেজী জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। যোগ্য সদস্য নির্বাচনের জন্য অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিবের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। বাকি দু’জনের মধ্যে সদস্য সচিব হবেন মন্ত্রণালয়ের কর্মরত উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এই সার্চ কমিটি প্রার্থী নিয়োগের প্রক্রিয়া যাচাই বাছাই করে দেখবেন। সদস্য নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন মন্ত্রী মহোদয়। বর্তমানে মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে সার সংক্ষেপটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন হয়ে এলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হবে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওই কর্মকর্তা আরও জানান। কর্মকর্তা বলেন, আইডিআরএ এ দাপ্তরিক কাজে সহায়ক শক্তি হিসেবে সহকারী পরিচালকসহ বিভিন্ন পদে ৫২ জন নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মকর্তা ও কর্মচারি মিলিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় অনুমোদিত লোকবলের সংখ্যা বর্তমানে ১৫৫ জন হলেও তা নেই। অস্থায়ীভাবে কর্মকর্তা ৩০, অফিস সহায়ক ২১, অফিস সহকারী ২, গাড়িচালক ২, পরিচ্ছন্ন কর্মী ২ এবং মাস্টাররোলে ৫ জন গাড়িচালক রয়েছেন। স্থায়ীভাবে কম্পিউটার ডাটা এন্ট্রি অপারেটর রয়েছেন ১৪ জন। এ ছাড়া একজন চেয়ারম্যান, ৪ সদস্য, ৪ জন নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব), ৭ জন পরিচালক (উপ সচিব) আরও মোট ১৬টি পদ স্থায়ী। এর মধ্যে ১০টি পদই শূন্য! নিচের দিকে মোট ৭৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারি বর্তমানে আইডিআরএতে কর্মরত আছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বীমা বিষয়ে নন লাইফের অভিজ্ঞ ও উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অর্থকাগজকে বেশ হতাশার সঙ্গে বলেন, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং পেশীশক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবে দেশের বীমা খাত নড়বড়ে। রেটিং কমিটিতে শৃংখলা নেই । যিনি নিয়ম মেনে কাজ করছেন তার সংকট বেশি। তাকে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। বেআইনীভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছেন। অথচ, নিয়ন্ত্রক সেদিকে দেখেও দেখেন না! সরকারের পক্ষে দেশের বীমা খাতের দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান কর্তা ব্যক্তি এরিমধ্যে বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। দু’টি লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠেছে। বর্তমানে দেশে তথ্য ও প্রযুক্তির জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তা নিয়ে সচিত্র খবর ভাইরাল হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বীমা গ্রাহকরা তার বিচারের দাবী জানাচ্ছেন। অনিষ্পন্ন দাবীর সংখ্যা বাড়ছে। তিনি বলেন, বিশাল বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারি সংস্থায় জনবল মাত্র ১৫০ জন। তাও আবার বেশিরভাগই অস্থায়ী! অথচ এরাই মূল কাজ সম্পাদন করছেন। প্রায় সমান সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংকের লোকবল কয়েক হাজার। আইডিআরএ মন্ত্রণালয় বা সরকারি অন্যান্য দফতর থেকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত দেয়ার কাজেই শুধু নিয়োজিত! বদলি ও পদোন্নতির কারণে এরা আসা যাওয়ার মধ্যে থাকেন।

অস্থায়ীদের স্থায়ী করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে নন লাইফ বিশেষজ্ঞ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, আইডিআরএ উঁচু পদে একজন দু’জনের ওপর বীমা খাতের নির্ভরশীলতা না কমলে সামনে আর বিপদ হবে। দুর্নীতি ও অনিয়ম এ খাতে বাড়তেই থাকবে! ফলে বীমা খাতের ওপর গ্রাহকের আস্থা আর থাকবে না।

#

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version