মারুফা ইয়াসমিন অন্তরা ●
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জয়গান যখন বিশ্বমঞ্চে এক বিস্ময়কর উপাখ্যান হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে, ঠিক তখনই পর্দার অন্তরালে এক নীরব অথচ বিধ্বংসী রক্তক্ষরণ আমাদের জাতীয় সক্ষমতার মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এই রক্তক্ষরণ অন্য কিছু নয়—অবিরাম ‘পুঁজি পাচার’; যার অন্যতম প্রধান এবং শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’। দৃশ্যত এটি একটি আইনি সুযোগ বা নাগরিক অধিকার মনে হলেও, বাস্তবতার কঠোর জমিনে এটি আজ এক গভীর জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অর্থনৈতিক গতি প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে একটি রূঢ় সত্য বেরিয়ে আসে; রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী—যাদের শরীরের এক অংশ বাংলাদেশে থাকলেও প্রাণের শিকড় প্রোথিত বিদেশের মাটিতে, তাদের মাধ্যমেই দেশের সিংহভাগ অর্থ ও সম্পদ পাচার হচ্ছে। এই ‘দ্বৈত সত্তা’ সম্পন্ন ব্যক্তিরা একদিকে বাংলাদেশের সম্পদ ব্যবহার করে ফুলে-ফেঁপে উঠছেন, অন্যদিকে সেই অর্জিত মূলধনকে ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা কানাডার মতো দেশে পাচার করছেন। এটি কেবল একটি আইনি সুবিধা নয়, বরং এটি এখন বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত অন্তরায়। যখন রাষ্ট্রের অতন্দ্র প্রহরীদের আনুগত্য দুই ভাগে বিভক্ত থাকে, তখন জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা পলায়নপর মনোবৃত্তিই প্রাধান্য পায়। ফলে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে তার প্রাপ্য বিনিয়োগ থেকে, আর সাধারণ মানুষের শ্রমের ঘাম রূপান্তরিত হচ্ছে বিদেশের স্থাবর সম্পত্তিতে। মেধা পাচারের চেয়েও ভয়াবহ এই পুঁজি পাচার বা মুদ্রা পাচার মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্বৈত নাগরিকত্বের এই আড়ালে থাকা অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করা এবং এর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি।
একজন নাগরিক যখন দুটি ভিন্ন দেশের পাসপোর্ট পকেটে নিয়ে চলেন, তখন অবধারিতভাবেই তার মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক আনুগত্য দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান কিন্তু চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতির দেশে যখন নীতিনির্ধারণী বা উচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন ব্যক্তিরা দ্বৈত নাগরিকত্বের কবজ ধারণ করেন, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং এক ভয়াবহ নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর মূল কারণটি অত্যন্ত রূঢ়—তাদের অর্জিত বিশাল সম্পদ, পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুটি বাংলাদেশের মাটিতে নয়, বরং হাজার মাইল দূরের কোনো উন্নত জনপদে প্রোথিত থাকে। স্বাভাবিকভাবেই, দেশের কোনো চরম সংকটকালে বা অর্থনৈতিক অস্থিরতার মুহূর্তে এই শ্রেণিকে দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে দেখা যায় না। বরং তাদের মধ্যে এক প্রকার ‘ট্রানজিট মানসিকতা’ কাজ করে; যেখানে বাংলাদেশ কেবলই সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র, আর বিদেশ হলো সেই সম্পদ ভোগের নিরাপদ স্বর্গ। ফলস্বরূপ, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চেয়ে তারা বেশি সচেষ্ট থাকেন নিজের অবৈধ বা বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থকে দ্রুততম সময়ে দূরবর্তী কোনো ‘সেকেন্ড হোম’-এ পাচার করে দিতে। এটি কোনো নিছক ধারণা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন পরিসংখ্যান এর সাক্ষী। তথাকথিত এই ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ বা দ্বৈত নাগরিকদের হাত ধরেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের সিংহভাগ পাড়ি জমিয়েছে কানাডার বেগম পাড়া, দুবাইয়ের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা লন্ডনের আবাসন খাতে। যাদের পালানোর পথ আগে থেকেই মসৃণ করা থাকে, তাদের কাছে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা কেবলই একটি কাগুজে বুলি। এই যে ‘এক দেশে উপার্জন ও অন্য দেশে যাপন’—এই দ্বিমুখী নীতিই বাংলাদেশের পুঁজি গঠনের পথে আজ এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আমাদের জাতীয় সংহতিকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও চরম হতাশাজনক অধ্যায় হয়ে আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক -বাংলাদেশ ব্যাংক এর প্রধান অভিভাবকের সেই নজিরবিহীন আত্মসমর্পণ। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে -বিশেষ করে মে ও জুন মাসের সেই অস্থির সময়ে, যখন মার্কিন ডলারের তীব্র সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আশঙ্কাজনক পতন জাতীয় অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এক জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা ছিল রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো! রাষ্ট্রের মুদ্রানীতির প্রধান কর্ণধার হয়েও তিনি পরোক্ষভাবে নিজের চরম অসহায়ত্ব স্বীকার করে বলেছিলেন যে, সাধারণ মানুষ নিজে থেকে সচেতন না হলে মুদ্রা পাচার কিংবা হুন্ডির এই বিশাল নেটওয়ার্ক বন্ধ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ( উৎস -২০২৪ সালের ১১ মার্চ, ঢাকার সিআইডি সদর দপ্তরে অর্থ পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক এর সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের মন্তব্য)। একটি দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক যখন পাচারকারীদের সামনে এভাবে সাদা পতাকা উত্তোলন করেন, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে এই অসহায়ত্বের চেয়েও বড় চাঞ্চল্যকর ও নীতিবিবর্জিত দিকটি ছিল সেই নীতিনির্ধারকের নিজস্ব অবস্থান। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, এই শীর্ষ পদাধিকারী নিজেই দ্বৈত নাগরিকত্বের কবজধারী ছিলেন অথবা তার পরিবারের নিকটতম সদস্যরা বিদেশের মাটিতে স্থায়ী আবাসন গেড়েছিলেন। যখন একজন ‘আর্থিক অভিভাবক’ নিজেই নিজের জীবনের সুরক্ষা কবজ বা ‘এক পা’ বিদেশের মাটিতে নিশ্চিত করে রাখেন, তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীতিমালা এবং প্রতিটি পদক্ষেপে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ‘এক্সিট রুট’ সুরক্ষিত করার তাগিদই বেশি ফুটে ওঠে। জনমনে এই গভীর ও যৌক্তিক সন্দেহের উদ্রেক হয় যে—তার প্রণীত নীতিগুলো কি সত্যিই পাচার রোধের জন্য ছিল, নাকি পাচারের পথকে আরও সুগম করার সুনিপুণ এক কৌশল ছিল? এটি কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্খলন নয়, বরং এটি গভীর ও পদ্ধতিগত ত্রুটি। রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল তদারকি দফতরগুলোর শীর্ষ পদে যখন এমন ব্যক্তিদের বসানো হয় যাদের দায়বদ্ধতা বিদেশের মাটির প্রতি বেশি, তখন সেই রাষ্ট্রের অর্থনীতি একটি ছিদ্রযুক্ত কলসির মতো হয়ে পড়ে, যা দিয়ে মেহনতি মানুষের রক্ত পানি করা অর্জনগুলো প্রতিনিয়ত পাচার হয়ে যায় বিদেশের মাটিতে।
গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রা পর্যবেক্ষক সংস্থার শিউরে ওঠার মতো তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের এক সুবিশাল অংক পাচার হয়ে যাচ্ছে। অংকটি কেবল কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির পঙ্গুত্বের খতিয়ান। এই বিপুল পুঁজি পাচারের নেপথ্য কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর সিংহভাগই সম্পন্ন হচ্ছে আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ বা রফতানিতে ‘আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মতো তা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক কারসাজির মাধ্যমে। আর এই ডিজিটাল ও নথিপত্রভিত্তিক চুরির নেপথ্যে যারা মূল কারিগর, তাদের পরিচয় অনুসন্ধান করলে চমকপ্রদ এক সমীকরণ বেরিয়ে আসবে। তা হলো এদের প্রায় সকলেই হয় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী সুবিধাভোগী, অথবা তাদের পরিবারের সদস্যরা বিদেশের মাটিতে স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করে রেখেছেন। যাদের কানাডার টরন্টোতে ‘বেগম পাড়া’ আছে কিংবা দুবাই ও লন্ডনের অভিজাত এলাকায় নামিদামি রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা ছড়িয়ে আছে, তাদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোনো গর্বের স্থান নয় বরং তা কেবলই অর্থ লুঠতরাজ করার এক উর্বর ক্ষেত্র। তাদের যাপনের কেন্দ্রবিন্দুটি বিদেশের মাটিতে হওয়ায় বাংলাদেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা শূন্যের কোঠায়। মূলত এই পলায়নপর ও পরজীবী মানসিকতাই দেশের ব্যাংকিং খাতকে আজ খেলাপি ঋণের এক দুর্ভেদ্য পাহাড়ে পরিণত করেছে; কারণ তারা জানেন, এ দেশের ব্যাংক থেকে নেওয়া হাজার কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার চেয়ে তা বিদেশে পাচার করে দেওয়া তাদের ‘সেকেন্ড হোমের’ ভবিষ্যৎকে অনেক বেশি সুরক্ষিত করবে। প্রকৃত উন্নয়ন কেবল কংক্রিটের বড় বড় অবকাঠামো কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির জাদুকরী সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একটি জাতির প্রকৃত সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ মূলধনের স্থানীয় বিনিয়োগের সক্ষমতার ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দ্বৈত নাগরিকত্বের কবজ ধারণকারী প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ছিদ্রপথগুলো ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে তুলে নিচ্ছেন এবং সেই ঋণের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করে বিদেশের মাটিতে নিজেদের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য গড়ছেন। এই প্রক্রিয়ায় দেশ তিনটি স্তরে ভয়াবহ বঞ্চনার শিকার হচ্ছে-
একজন নাগরিক যখন দুটি ভিন্ন দেশের পাসপোর্ট পকেটে নিয়ে চলেন, তখন অবধারিতভাবেই তার মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক আনুগত্য দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান কিন্তু চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতির দেশে যখন নীতিনির্ধারণী বা উচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন ব্যক্তিরা দ্বৈত নাগরিকত্বের কবজ ধারণ করেন, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং এক ভয়াবহ নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর মূল কারণটি অত্যন্ত রূঢ়—তাদের অর্জিত বিশাল সম্পদ, পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুটি বাংলাদেশের মাটিতে নয়, বরং হাজার মাইল দূরের কোনো উন্নত জনপদে প্রোথিত থাকে। স্বাভাবিকভাবেই, দেশের কোনো চরম সংকটকালে বা অর্থনৈতিক অস্থিরতার মুহূর্তে এই শ্রেণিকে দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে দেখা যায় না। বরং তাদের মধ্যে এক প্রকার ‘ট্রানজিট মানসিকতা’ কাজ করে; যেখানে বাংলাদেশ কেবলই সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র, আর বিদেশ হলো সেই সম্পদ ভোগের নিরাপদ স্বর্গ। ফলস্বরূপ, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চেয়ে তারা বেশি সচেষ্ট থাকেন নিজের অবৈধ বা বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থকে দ্রুততম সময়ে দূরবর্তী কোনো ‘সেকেন্ড হোম’-এ পাচার করে দিতে। এটি কোনো নিছক ধারণা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন পরিসংখ্যান এর সাক্ষী। তথাকথিত এই ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ বা দ্বৈত নাগরিকদের হাত ধরেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের সিংহভাগ পাড়ি জমিয়েছে কানাডার বেগম পাড়া, দুবাইয়ের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা লন্ডনের আবাসন খাতে। যাদের পালানোর পথ আগে থেকেই মসৃণ করা থাকে, তাদের কাছে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা কেবলই একটি কাগুজে বুলি। এই যে ‘এক দেশে উপার্জন ও অন্য দেশে যাপন’—এই দ্বিমুখী নীতিই বাংলাদেশের পুঁজি গঠনের পথে আজ এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আমাদের জাতীয় সংহতিকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও চরম হতাশাজনক অধ্যায় হয়ে আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক -বাংলাদেশ ব্যাংক এর প্রধান অভিভাবকের সেই নজিরবিহীন আত্মসমর্পণ। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে -বিশেষ করে মে ও জুন মাসের সেই অস্থির সময়ে, যখন মার্কিন ডলারের তীব্র সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আশঙ্কাজনক পতন জাতীয় অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এক জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা ছিল রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো! রাষ্ট্রের মুদ্রানীতির প্রধান কর্ণধার হয়েও তিনি পরোক্ষভাবে নিজের চরম অসহায়ত্ব স্বীকার করে বলেছিলেন যে, সাধারণ মানুষ নিজে থেকে সচেতন না হলে মুদ্রা পাচার কিংবা হুন্ডির এই বিশাল নেটওয়ার্ক বন্ধ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ( উৎস -২০২৪ সালের ১১ মার্চ, ঢাকার সিআইডি সদর দপ্তরে অর্থ পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক এর সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের মন্তব্য)। একটি দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক যখন পাচারকারীদের সামনে এভাবে সাদা পতাকা উত্তোলন করেন, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে এই অসহায়ত্বের চেয়েও বড় চাঞ্চল্যকর ও নীতিবিবর্জিত দিকটি ছিল সেই নীতিনির্ধারকের নিজস্ব অবস্থান। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, এই শীর্ষ পদাধিকারী নিজেই দ্বৈত নাগরিকত্বের কবজধারী ছিলেন অথবা তার পরিবারের নিকটতম সদস্যরা বিদেশের মাটিতে স্থায়ী আবাসন গেড়েছিলেন। যখন একজন ‘আর্থিক অভিভাবক’ নিজেই নিজের জীবনের সুরক্ষা কবজ বা ‘এক পা’ বিদেশের মাটিতে নিশ্চিত করে রাখেন, তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীতিমালা এবং প্রতিটি পদক্ষেপে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ‘এক্সিট রুট’ সুরক্ষিত করার তাগিদই বেশি ফুটে ওঠে। জনমনে এই গভীর ও যৌক্তিক সন্দেহের উদ্রেক হয় যে—তার প্রণীত নীতিগুলো কি সত্যিই পাচার রোধের জন্য ছিল, নাকি পাচারের পথকে আরও সুগম করার সুনিপুণ এক কৌশল ছিল? এটি কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্খলন নয়, বরং এটি গভীর ও পদ্ধতিগত ত্রুটি। রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল তদারকি দফতরগুলোর শীর্ষ পদে যখন এমন ব্যক্তিদের বসানো হয় যাদের দায়বদ্ধতা বিদেশের মাটির প্রতি বেশি, তখন সেই রাষ্ট্রের অর্থনীতি একটি ছিদ্রযুক্ত কলসির মতো হয়ে পড়ে, যা দিয়ে মেহনতি মানুষের রক্ত পানি করা অর্জনগুলো প্রতিনিয়ত পাচার হয়ে যায় বিদেশের মাটিতে।
গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রা পর্যবেক্ষক সংস্থার শিউরে ওঠার মতো তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের এক সুবিশাল অংক পাচার হয়ে যাচ্ছে। অংকটি কেবল কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির পঙ্গুত্বের খতিয়ান। এই বিপুল পুঁজি পাচারের নেপথ্য কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর সিংহভাগই সম্পন্ন হচ্ছে আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ বা রফতানিতে ‘আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মতো তা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক কারসাজির মাধ্যমে। আর এই ডিজিটাল ও নথিপত্রভিত্তিক চুরির নেপথ্যে যারা মূল কারিগর, তাদের পরিচয় অনুসন্ধান করলে চমকপ্রদ এক সমীকরণ বেরিয়ে আসবে। তা হলো এদের প্রায় সকলেই হয় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী সুবিধাভোগী, অথবা তাদের পরিবারের সদস্যরা বিদেশের মাটিতে স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করে রেখেছেন। যাদের কানাডার টরন্টোতে ‘বেগম পাড়া’ আছে কিংবা দুবাই ও লন্ডনের অভিজাত এলাকায় নামিদামি রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা ছড়িয়ে আছে, তাদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোনো গর্বের স্থান নয় বরং তা কেবলই অর্থ লুঠতরাজ করার এক উর্বর ক্ষেত্র। তাদের যাপনের কেন্দ্রবিন্দুটি বিদেশের মাটিতে হওয়ায় বাংলাদেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা শূন্যের কোঠায়। মূলত এই পলায়নপর ও পরজীবী মানসিকতাই দেশের ব্যাংকিং খাতকে আজ খেলাপি ঋণের এক দুর্ভেদ্য পাহাড়ে পরিণত করেছে; কারণ তারা জানেন, এ দেশের ব্যাংক থেকে নেওয়া হাজার কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার চেয়ে তা বিদেশে পাচার করে দেওয়া তাদের ‘সেকেন্ড হোমের’ ভবিষ্যৎকে অনেক বেশি সুরক্ষিত করবে। প্রকৃত উন্নয়ন কেবল কংক্রিটের বড় বড় অবকাঠামো কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির জাদুকরী সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একটি জাতির প্রকৃত সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ মূলধনের স্থানীয় বিনিয়োগের সক্ষমতার ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দ্বৈত নাগরিকত্বের কবজ ধারণকারী প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ছিদ্রপথগুলো ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে তুলে নিচ্ছেন এবং সেই ঋণের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করে বিদেশের মাটিতে নিজেদের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য গড়ছেন। এই প্রক্রিয়ায় দেশ তিনটি স্তরে ভয়াবহ বঞ্চনার শিকার হচ্ছে-
বিনিয়োগের তীব্র সংকট দেশের মেহনতি মানুষের গচ্ছিত পুঁজি বিদেশের বাজারে পাচার হয়ে যাওয়ায় দেশীয় স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং বৃহৎ শিল্প খাতে এক ভয়াবহ তারল্য সংকট ও রক্তশূন্যতা দেখা দিচ্ছে। আমাদের টাকা দিয়ে উন্নত হচ্ছে পরদেশ, আর আমাদের উদ্যোক্তারা পুঁজির অভাবে অংকুরেই বিনষ্ট হচ্ছে।
আকাশচুম্বী সামাজিক বৈষম্য সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও চাকরিজীবী মানুষ করের বোঝা মাথায় নিয়ে তিলে তিলে দেশ গড়ছেন, আর একটি বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সেই করের টাকায় নির্মিত রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পদ কুক্ষিগত করছে এবং শেষ পর্যন্ত তা দেশের সীমানার বাইরে পাচার করে দিচ্ছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্রের সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
নীতিনির্ধারণী পঙ্গুত্ব যখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা মনেপ্রাণে জানেন যে তাদের ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বিদেশের কোনো ঝকঝকে উন্নত শহরে সুনিশ্চিত, তখন তারা দেশের টেকসই উন্নয়নের চেয়ে ‘দ্রুত মুনাফা’ এবং ‘ব্যক্তিগত স্বার্থান্বেষী’ নীতি প্রণয়নেই বেশি উৎসাহী হন। এই ধরনের নীতিনির্ধারকদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়, কারণ তাদের হৃদয় কখনো বাংলাদেশের মাটির স্পন্দন অনুভব করে না।
বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনা অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব অনেক ক্ষেত্রে কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ হলেও, বাস্তবতার নির্মম পরিহাস হলো—পর্দার আড়ালে এই ‘দ্বৈত সত্তা’ আজ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত বিদেশে অবৈধ সম্পদ ও স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলা আমলা ও ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের তালিকা তলব করলেও, এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে সেই তালিকা কখনোই আলোর মুখ দেখে না। আমরা যখন দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া তরুণদের ‘মেধা পাচার’ (Brain Drain) নিয়ে সমালোচনা করি, তখন আমরা সুবিধাজনকভাবে সেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে ভুলে যাই, যারা দেশের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা আর ক্ষমতার মধু ভোগ করে বিদেশের মাটিতে নিজেদের গোপন সাম্রাজ্য গড়ে তুলছেন। অথচ আজ সময় এসেছে এই সত্যটি অনুধাবন করার যে -মেধা পাচার আমাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে সীমিত করে ঠিকই, কিন্তু ‘পুঁজি পাচার’ বা সম্পদ পাচার আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিকেই তিলে তিলে ধসিয়ে দিচ্ছে। উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা সুযোগ পেলে হয়তো দেশে ফিরে আসে, কিন্তু দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া কোটি কোটি ডলার আর কখনোই ফিরে আসে না।
বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। সময় এসেছে একটি আপসহীন ও কঠোর আইনি কাঠামো বা ‘রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করার। যেখানে বিশেষ করে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর নিরাপত্তা পদ, বিচার বিভাগ এবং আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণী আসনে দ্বৈত নাগরিকদের নিয়োগ সম্পূর্ণ ও চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হবে। দ্বৈত নাগরিকত্ব যদি কেবল জ্ঞান অর্জন বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন হতো, তবে তা আশীর্বাদ হতে পারতো; কিন্তু বর্তমানে এটি আমাদের দেশের জন্য মুদ্রাপাচারের একটি শক্তিশালী ‘আইনি ঢাল’ এবং পলায়নপর রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০৪১ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের এমন একটি আপসহীন নেতৃত্ব প্রয়োজন যাদের ধ্যান, জ্ঞান, স্বপ্ন এবং অর্জিত সম্পদ-সবটুকুই থাকবে কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতরে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল দৃশ্যমান ইট-পাথরের সেতু, উড়াল সড়ক কিংবা টানেল দিয়ে একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়, যদি সেই উন্নয়নের জীবনীশক্তি বা পুঁজি প্রতিনিয়ত ছিদ্রপথ দিয়ে অন্য কোনো উন্নত দেশের ধমনীতে প্রবাহিত হয়। দেশীয় পুঁজি দেশেই বিনিয়োগ হওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এমন এক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে ‘এক দেশ, এক আনুগত্য’ হবে নাগরিকত্বের প্রধান ও আবশ্যিক শর্ত। বাংলাদেশ কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য কেবল টাকা বানানোর মেশিন বা লুটের চারণভূমি নয়; এটি দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের রক্তে ভেজা ভবিষ্যৎ। আর সেই পবিত্র ভবিষ্যৎকে যারা বিদেশের কোনো ব্যাংকের ভল্টে বা বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেটে বন্ধক রাখতে চান, তাদের হাতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী চাবিকাঠি অর্পণ করা হবে আত্মহত্যার শামিল। মেধা পাচার রুখে দেওয়ার পাশাপাশি সম্পদ পাচারের এই বিশাল মহোৎসব বন্ধ করতে না পারলে, আমাদের সব অর্জনই একদিন বিদেশের মাটিতে অন্যের সমৃদ্ধির খোরাক হয়ে যাবে। তাই দেশ প্রেমের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হোক নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আজ এবং এখনই। ●
বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনা অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব অনেক ক্ষেত্রে কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ হলেও, বাস্তবতার নির্মম পরিহাস হলো—পর্দার আড়ালে এই ‘দ্বৈত সত্তা’ আজ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত বিদেশে অবৈধ সম্পদ ও স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলা আমলা ও ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের তালিকা তলব করলেও, এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে সেই তালিকা কখনোই আলোর মুখ দেখে না। আমরা যখন দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া তরুণদের ‘মেধা পাচার’ (Brain Drain) নিয়ে সমালোচনা করি, তখন আমরা সুবিধাজনকভাবে সেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে ভুলে যাই, যারা দেশের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা আর ক্ষমতার মধু ভোগ করে বিদেশের মাটিতে নিজেদের গোপন সাম্রাজ্য গড়ে তুলছেন। অথচ আজ সময় এসেছে এই সত্যটি অনুধাবন করার যে -মেধা পাচার আমাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে সীমিত করে ঠিকই, কিন্তু ‘পুঁজি পাচার’ বা সম্পদ পাচার আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিকেই তিলে তিলে ধসিয়ে দিচ্ছে। উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা সুযোগ পেলে হয়তো দেশে ফিরে আসে, কিন্তু দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া কোটি কোটি ডলার আর কখনোই ফিরে আসে না।
বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। সময় এসেছে একটি আপসহীন ও কঠোর আইনি কাঠামো বা ‘রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করার। যেখানে বিশেষ করে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর নিরাপত্তা পদ, বিচার বিভাগ এবং আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণী আসনে দ্বৈত নাগরিকদের নিয়োগ সম্পূর্ণ ও চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হবে। দ্বৈত নাগরিকত্ব যদি কেবল জ্ঞান অর্জন বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন হতো, তবে তা আশীর্বাদ হতে পারতো; কিন্তু বর্তমানে এটি আমাদের দেশের জন্য মুদ্রাপাচারের একটি শক্তিশালী ‘আইনি ঢাল’ এবং পলায়নপর রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০৪১ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের এমন একটি আপসহীন নেতৃত্ব প্রয়োজন যাদের ধ্যান, জ্ঞান, স্বপ্ন এবং অর্জিত সম্পদ-সবটুকুই থাকবে কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতরে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল দৃশ্যমান ইট-পাথরের সেতু, উড়াল সড়ক কিংবা টানেল দিয়ে একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়, যদি সেই উন্নয়নের জীবনীশক্তি বা পুঁজি প্রতিনিয়ত ছিদ্রপথ দিয়ে অন্য কোনো উন্নত দেশের ধমনীতে প্রবাহিত হয়। দেশীয় পুঁজি দেশেই বিনিয়োগ হওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এমন এক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে ‘এক দেশ, এক আনুগত্য’ হবে নাগরিকত্বের প্রধান ও আবশ্যিক শর্ত। বাংলাদেশ কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য কেবল টাকা বানানোর মেশিন বা লুটের চারণভূমি নয়; এটি দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের রক্তে ভেজা ভবিষ্যৎ। আর সেই পবিত্র ভবিষ্যৎকে যারা বিদেশের কোনো ব্যাংকের ভল্টে বা বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেটে বন্ধক রাখতে চান, তাদের হাতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী চাবিকাঠি অর্পণ করা হবে আত্মহত্যার শামিল। মেধা পাচার রুখে দেওয়ার পাশাপাশি সম্পদ পাচারের এই বিশাল মহোৎসব বন্ধ করতে না পারলে, আমাদের সব অর্জনই একদিন বিদেশের মাটিতে অন্যের সমৃদ্ধির খোরাক হয়ে যাবে। তাই দেশ প্রেমের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হোক নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আজ এবং এখনই। ●
লেখক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও কলাম লেখক
antora00111@gmail.com
অকা/নিলে/ দুপুর/ ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে


