অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে—এমনটাই ধারণা করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। যদিও এই প্রবৃদ্ধি এখনও প্রত্যাশার তুলনায় কম, তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এটিকে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এডিবির প্রকাশিত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকার পর এবার তা কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এমনকি আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ৪.৭ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। অর্থনীতির এই ধীর পুনরুদ্ধারের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ভোগব্যয় ও বিনিয়োগের ধীরে ধীরে বৃদ্ধি।
বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে আসা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বাণিজ্য ও আর্থিক খাতের চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে সঠিক নীতি ও ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে যেতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন সরকারের নেওয়া সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব পদক্ষেপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথ সুগম হবে।
তবে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এডিবির মতে, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এর পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে আগামী অর্থবছরে এই চাপ কিছুটা কমে ৮.৫ শতাংশে নেমে আসার আশা করা হচ্ছে।
বহিঃখাতের দিক থেকেও কিছু চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির প্রায় ০.৫ শতাংশ হতে পারে, যা পরবর্তী অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ০.৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আমদানি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি।
এডিবি মনে করছে, দেশের সেবা খাত ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করবে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের মাধ্যমে আরও গতি পাবে। পাশাপাশি অনুকূল আবহাওয়া ও সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে কৃষি খাতও স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে। শিল্প খাতেও উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ার ফলে।
তবে এই ইতিবাচক পূর্বাভাসের পাশাপাশি কিছু ঝুঁকির কথাও সতর্কভাবে তুলে ধরেছে সংস্থাটি। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি বাজার, পরিবহন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এতে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গিয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে থাকলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়তে পারে, যা বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ অর্থনীতি এখন এক ধরনের ‘সংবেদনশীল পুনরুদ্ধার’-এর পর্যায়ে রয়েছে—যেখানে সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি সতর্কতারও যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। ●
অকা/প্র/ই/দুপুর/১১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

