অর্থকাগজ প্রতিবেদন

বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা ও বুথে চলছে টাকার সংকট। এতে স্বাভাবিক কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ। চলতি মাসের শুরু থেকে চলমান কোটা সংস্কার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নিরাপত্তা সংকট, বন্যা পরিস্থিতি, ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলন সীমা দুই লাখ থেকে ধাপে ধাপে চার লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া এবং নগদ টাকার সরবরাহ কমে যাওয়ায় সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও বাণিজ্যের মন্থর গতি দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্বস্তি বিরাজ করছে।

জানা যায়, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর শহর চট্টগ্রাম। এ শহরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় বড় শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের ভোগ্যপণ্য, শিল্পপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ও বিপণন কার্যক্রমের সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি ডিলার ও পাইকার ব্যবসায়ী, যাদের বেশিরভাগই নগদ টাকায় লেনদেন করেন। এর পাশাপাশি পণ্য আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহৃত যানবাহনের বিল পরিশোধসহ এ কাজে জড়িত অনেক খাতের ব্যয় নগদ টাকায় করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক চলমান পরিস্থিতির কারণে নগদ টাকা উত্তোলনে দুই লাখ টাকা থেকে ধাপে ধাপে চার লাখ টাকা পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করে দেয়। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ব্যাংকের বুথ ও অনলাইনে ফান্ড ট্রান্সফারের পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে।

এতে বিপাকে পড়তে হয় ভোগ্যপণ্য, শিল্পপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ও বিপণন কার্যক্রমের সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি ডিলার ও পাইকার, পণ্য আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহৃত যানবাহনের মালিক, শ্রমিকসহ এ খাতের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা। আবার কাস্টমসের পণ্যের শুল্কায়ন ও শিপিং এজেন্টদের দেনা পরিশোধে ১০টির মতো ব্যাংকের পে-অর্ডারও নগদায়ন না হওয়ায় বিপাকে আছেন সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীরা। সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীরা বলেন, ব্যাংক তো বন্ধ হয়ে যায়নি। তবুও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ১০টির মতো ব্যাংকের পে-অর্ডার নিচ্ছে না। খাতুনগঞ্জ এলাকার তেলের পাইকারি বিক্রেতা আবু আহমেদ বলেন, ‘যে ব্যাংকে আমার অ্যাকাউন্ট, সেখান থেকে চার লাখ টাকাও তোলা যাচ্ছে না।

বিষয়টা খুবই সমস্যার। ব্যবসা চালাতে সমস্যায় পড়ছি। আমাদের বেশিরভাগ ব্যবসায়িক লেনদেন নগদ টাকায় করতে হয়। আমাদের জন্য এখন ব্যাংক থেকে ব্যাংকে পাঠানো কঠিন কাজ। তারপরও লেনদেনে এনপিএসবি ও ডাউন থাকায় লেনদেন হচ্ছে না। অন্যদিকে রিয়াজউদ্দিন বাজারের কাঁচা পণ্যের আড়তদার ও ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন বলেন, আমাদের পুরো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া হলো নগদ টাকার ওপর ভর করে চলে। পার্টি গাড়ি দিয়ে মাল পৌঁছে দেবে, সঙ্গে নগদ টাকা দিয়ে যাবে। তাদের সঙ্গে লেনদেনে চেক ও বাকি চলে না। ফলে ব্যবসা পরিচালনা করা নিয়ে বিপাকে আছি।

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, চলতি সপ্তাহে প্রতিটি অ্যাকাউন্ট থেকে দৈনিক চার লাখ টাকার বেশি তোলা যাবে না। আবার ব্যাংকে নগদ টাকার সংকটের কারণে অনেক গ্রাহক সীমার মধ্যেও তার প্রয়োজনীয় পরিমাণ টাকা পাননি। কারণ নিরাপত্তার অভাবে নিয়মিত নগদ টাকা এটিএম বুথ ও ব্যাংকের শাখায় পাঠানো যাচ্ছে না। বেশ কয়েকজন ব্যাংকার এ প্রতিবেদককে বলেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যা পরিস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতি এবং সার্বিক নিরাপত্তা সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোয় নগদ টাকার ধারণক্ষমতা কম। চাইলেও টাকা সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক। তবে আমাদের অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালু আছে। এতে আমাদের গ্রাহকের সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে জানি। আশা করছি এমন সংকটের সমাধান হবে।

চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের সীমায় হয়তো এই সপ্তাহ চলতে পারবেন। যদি নগদ টাকার সংকট বাড়তে থাকে এবং আগামী সপ্তাহেও বিধিনিষেধ চলতে থাকে, তবে তারা আরও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়বেন। এতে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় সংকট দেখা দিতে পারে। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সারাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে তাদের ব্যবসা বন্ধ ছিল।

খাতুনগঞ্জ এলাকার আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদ মহিউদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সব ব্যবসায়ী চেক নেন না। অনেককে নগদ টাকা দিতে হয়। এখন ব্যাংক থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র চার লাখ টাকা। অথচ আমাদের দিনে অনেক টাকা নগদ টাকা লাগে। এখন লেনদেন কেবল ব্যাংক থেকে ব্যাংকে করা যাচ্ছে। চেকের মাধ্যমে দেয়া যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

চট্টগ্রামভিত্তিক বড় একটি শিল্পগ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায় কাঁচামাল সরবরাহকারীদের টাকা দিতে সমস্যা হচ্ছে। ছোট বিক্রেতা ও স্থানীয় ডিলারদের অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। তাদের নগদ টাকা দিতে হয়। টাকা তোলায় সীমাবদ্ধতা থাকায় নগদ অর্থের সংকটে আছি। আমাদের যে পরিমাণ নগদ টাকা দরকার, তা তুলতে পারছি না। এটা তো একটা বড় সমস্যা। আবার যারা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন, তাদের পুরো টাকা দিতে পারছি না। আমি শ্রমিকদের এই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে বলেছি। কারণ এখন নগদ টাকা তোলার উপায় নেই।

অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল, ২৬ আগস্ট, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version