অর্থকাগজ প্রতিবেদন

দেশের বিলুপ্ত ও ভরাট হয়ে যাওয়া নদী-খাল পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেল চালুর আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির মতে, নদী ও খাল সচল করা গেলে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য গতিশীল হবে, কৃষিতে পানির সরবরাহ বাড়বে এবং পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে পরিবহন ব্যয় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

বুধবার রাজধানীতে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা’ বিষয়ক এক সেমিনারে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ স্বাগত বক্তব্যের পাশাপাশি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।

মূল প্রবন্ধে তাসকীন আহমেদ বলেন, একসময় বাংলাদেশে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার খালের নেটওয়ার্ক এবং ১ হাজার ৪১৫টি নদী ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল, অবহেলা ও পলি জমার কারণে বর্তমানে ৫৫ শতাংশের বেশি খাল বিলুপ্ত বা অকার্যকর হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৬৫ কিলোমিটারে। ফলে দেশের মোট পণ্য পরিবহনের ৭৭ শতাংশই এখন সড়কপথনির্ভর, যা পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি যানজট ও পরিবেশ দূষণও বৃদ্ধি করছে।

তিনি জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম নৌপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে খরচ হয় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। একই পণ্য সড়কপথে পরিবহনে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ নৌপথের ব্যয় সড়কপথের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

রাজধানীর ১১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সার্কুলার ওয়াটারওয়েকে কার্যকর করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীঘেরা এ নৌপথের সঙ্গে মান্ডা, জিরানি ও কল্যাণপুরসহ অভ্যন্তরীণ খালগুলোর সংযোগ পুনরুদ্ধার করা গেলে ঢাকার যানজটজনিত বছরে ৩ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

প্রবন্ধে দেশের চলমান খাল ও নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং ৫২০টি বিলুপ্ত নদীসহ হাজার হাজার খাল পুনঃখননের লক্ষ্যে কাজ চলছে। প্রথম ১৮০ দিনে ১ হাজার কিলোমিটার খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে আরও ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, দেশের প্রায় ৩০ হাজার খাল চিহ্নিত করতে ৩১ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে জিআইএস ম্যাপিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। দিনাজপুরের সাহাপাড়া পাইলট প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, সেখানে বর্ষার পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে কম খরচে সেচ নিশ্চিত হয়েছে। এতে গভীর নলকূপ পরিচালনায় ডিজেল ও বিদ্যুৎ ব্যয় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।

নদী ও খাল পুনঃখননের ক্ষেত্রে দ্রুত পলি জমে যাওয়া, অবৈধ দখল এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে ডিসিসিআই বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্পমেয়াদি ড্রেজিংয়ের পরিবর্তে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি পারফরম্যান্সভিত্তিক পিপিপি চুক্তি চালু, জাতীয় লজিস্টিকস নীতি-২০২৫-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন, কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক ডিজিটাল রেজিস্ট্রি তৈরি, খালের সংযোগস্থলে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং বেসরকারি খাতকে ড্রেজার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বিনিয়োগের মাধ্যমে অংশীদার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি।

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version