অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতি—যাকে ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’ বলা হয়—প্রচলিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে। তবু নীতিনির্ধারণী অঙ্গনে এর উপস্থিতি এখনো প্রায় অদৃশ্য। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এই খাত জিডিপিতে ৯ হাজার কোটির বেশি অবদান রেখেছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এত দ্রুত বাড়তে থাকা একটি খাতকে কেন এখনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হয়, অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ দেখাচ্ছে, শিল্প, বিনোদন ও অবকাশ খাতে কর্মসংস্থান এক দশকে ৩৩ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ১২ হাজার ছাড়িয়েছে—প্রবৃদ্ধি প্রায় আড়াই গুণ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিস্তার ঘটেছে কোনো শক্তিশালী সরকারি নীতিগত সহায়তা ছাড়াই। বাজারের চাহিদা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং ফ্রিল্যান্স অর্থনীতির ওপর ভর করেই খাতটি এগোচ্ছে।
সাম্প্রতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক তথ্যও একই প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সৃজনশীল অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ৯,১৯৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫.৪ শতাংশ বেশি—জাতীয় গড় প্রবৃদ্ধির চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে উঁচু। কৃষি, শিল্প বা সেবা—সব খাতের তুলনায় এই বৃদ্ধির গতি বেশি হলেও, সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর অংশ এখনো মাত্র ০.১৭ শতাংশ।
এই বৈপরীত্যই মূল সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু স্বীকৃতি নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাংলাদেশের নীতিগত কাঠামোর একটি দীর্ঘস্থায়ী সীমাবদ্ধতা। তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স ও কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা এতটাই গভীর যে, সৃজনশীলতাকে কখনোই একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক সাকিব বিন আমিনের মতে, এই খাত এখনো মূলত অনানুষ্ঠানিক এবং পেশাগতভাবে অনিশ্চিত। সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি থাকলেও অধিকাংশ কর্মীর আয় অস্থির, সামাজিক নিরাপত্তা নেই, পেনশন বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা অনুপস্থিত। তিনি বলেন, অল্প কিছু শিল্পীই কেবল তাদের কাজকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে ধরে রাখতে পারেন; বাকিদের জন্য এটি পার্শ্ব-পেশা হিসেবেই রয়ে যায়।
তার মতে, এই বাস্তবতা পরিবর্তনে জরুরি ভিত্তিতে নীতিগত স্বীকৃতি দরকার। শিল্পী ও সৃজনশীল কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনা, পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য।
বিশ্বব্যাপী ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’ ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির উৎসে পরিণত হয়েছে। শিল্পকলা, চলচ্চিত্র, সংগীত, ডিজাইন, গেমিং—সব মিলিয়ে এটি কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে এই খাত জিডিপির ০.৫ থেকে ৭.৩ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখছে এবং কর্মসংস্থানের বড় অংশ জুড়ে আছে।
বাংলাদেশে এর বিপরীতে সরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত। সংস্কৃতি, তথ্য ও ক্রীড়া—এই তিনটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় মিলে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বাজেটের ১ শতাংশেরও কম বরাদ্দ পাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই হার ০.৮১ শতাংশের বেশি নয়। অথচ একই সময়ে এই খাতে জনশক্তি বেড়েছে কয়েকগুণ।
সমস্যাটি শুধু অর্থ বরাদ্দের পরিমাণে নয়, বরং ব্যয়ের কাঠামোতেও। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সৃজনশীল দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কন্টেন্ট তৈরির সমন্বয় না ঘটালে এই খাতের সম্ভাবনা পূর্ণতা পাবে না।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। প্রতিবেশী ভারত ইতোমধ্যে অ্যানিমেশন, ভিএফএক্স, গেমিং ও কমিকস খাতকে কেন্দ্র করে বৃহৎ নীতি উদ্যোগ নিয়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কন্টেন্ট ক্রিয়েশন অবকাঠামো গড়ে তুলছে। তুলনায় বাংলাদেশে এখনো কোনো সুসংহত কৌশল দৃশ্যমান নয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলছে। সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে ক্রীড়া ও সংগীত শিক্ষার প্রসার, তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা খোঁজার উদ্যোগ এবং সৃজনশীল খাতকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার কথা বলছে। রাজনৈতিক অঙ্গীকারেও এই খাতের জিডিপি অংশ ১.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং লাখো কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন একটাই—এই সম্ভাবনাময় খাত কি অবশেষে নীতিগত স্বীকৃতি পাবে, নাকি আগের মতোই ‘সংস্কৃতি’ পরিচয়ের আড়ালে থেকে যাবে? বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি নির্ধারণে এর উত্তরই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

