প্রণব মজুমদার ●
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন ত্রিশ হাজার টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। যার মধ্যে সাত হাজার টন উৎপাদন হয় ঢাকা শহরে এবং এর মধ্যে দশ শতাংশই হচ্ছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক। হিসাবটি দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে। প্লাস্টিকের একটা অংশ রিসাইকেল করা হলেও, তা সামান্য, তার মানে ঢাকাতেই প্রতিদিন প্রায় ৭০০ টন বা তারও বেশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ঢাকার ড্রেন, জলাভূমি, খাল, নদী ও পরিত্যক্ত স্থানে জমতে থাকে। আবার এসব বর্জ্য পরিবেশসম্মতভাবে ব্যবস্থাপনার অভাবে নির্বিচারে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। শহর অঞ্চলের খালগুলো তো অবশ্যই, পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে নদীগুলোও নর্দমা হওয়ার দশা। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৬৫টি খালের মধ্যে ২২টি খাল ভরে গেছে মূলত পলিথিনের কারণে। বাদ নেই বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীও। আজকাল মাছে পেটেও পলিথিন দেখা যায়। পলিথিন যে কীভাবে খাল ও নদী গিলে ফেলেছে তার প্রমাণ মোহাম্মদপুরের সোসাইটি খাল, মিরপুরের প্যারিস ও হবিগজ্ঞের খোয়াই নদী। অবশ্যই সবক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি সমস্যা। পরিবেশ দূষণের বিষয়টি বিবেচনা করলে পলিথিনের বিপর্যয় এখন এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখান সমাধানের পথ খোঁজা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। পলিথিন বন্ধের সরকারি প্রতিশ্রুতি আগেও ছিল।
পরিবেশের জন্য বড় সমস্যা হচ্ছে, ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাপক দূষণ। পলিথিন ব্যাগ, বিভিন্ন পণ্য সামগ্রিক মোড়ক ও পেট বোতল। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক যোগে প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করা হয়। তবে এই ধরণের পলিথিনের বিপদটা আরও বিস্তৃত এবং দিনে দিনে বাড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রভাবের মতো। নগর তো বটেই, গ্রামেও দিনে দিনে এর প্রকোপ বাড়ছে।
কয়েক দশকে দেশে বাজার ব্যবস্থাপনায় একটি পলিথিন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে মূলত উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দাপটে। সে ক্ষেত্রে ভোক্তারাও কম যান না। আমাদের প্রত্যেকটা বাজার একেকটা যেন আস্ত পলিথিনের গোডাউন। ক্রেতা ও বিক্রেতা সবাই যেন পলিথিনেই ভরসা খুঁজে পায়। প্রতিদিনের চাল, ডাল, আলু ও অন্যান্য বাজারের সঙ্গে থরে থরে পলিথিন আসতে থাকে ঘরে, তার কোনো কোনোটা এক-দুবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয় অন্যসব গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে। এতে করে ব্যাপক পরিমাণ পলিথিন বর্জ্য তৈরি করছে। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রতিদিন আড়াই কোটি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। অসচেতন লোকজন ব্যববহারের পর তাও রাস্তা ও যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ দূষণকে ত্বরান্বিত করছে।
২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার ৯০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তা বাস্তবায়ন হলে সবার জন্যই মঙ্গল। প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার ও রিসাইকেল দুটোই পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যাওয়া ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া একই সুতায় গাঁথা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের জীবন চক্রের প্রত্যেকটি পর্যায়ে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে থাকে, এর শুরু থেকে রিসাইকেল করা পর্যন্ত। পৃথিবীর ৩ শতাংশ গ্রিন হাউজ গ্যাসের জন্য দায়ী প্লাস্টিক পণ্য এবং তা ধীরে ধীরে আরও বাড়ছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শুধু সচেতনতা সৃষ্টি ও জনগণের অভ্যাসগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এর জন্য এখন প্রয়োজন পলিথিনবিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং এর মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা। পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুবই প্রয়োজন, তবে তা করতে হবে উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে। অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিমধ্যে প্রকৃতিতে চলে যাওয়া পলিথিন সংগ্রহ করে যতটুকু সম্ভব ততটুকু পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনায় আওতায় নিয়ে আসতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আর সেটাই হবে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঠিক উদ্যোগ। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ থাকলে খাল বা প্রাকৃতিক জলাধারগুলোতে প্লাস্টিক মুক্ত করা কঠিন কাজ নয়। এগুলোকে নর্দমা থেকে আবার প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে তৈরি করা সম্ভব। নতুন সরকার বিশেষ করে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ পরিবেশ উপদেষ্টার কাছে পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন দূষণমুক্ত করার বাস্তবমুখি উদ্যোগ গ্রহণ করার আহবান জানাই। ●
লেখক কথাসাহিত্যিক, কবি এবং অর্থকাগজ সম্পাদক
reporterpranab@gmail.com
অকা/প/বিকেল/৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

