অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
সরকারি সঞ্চয়ী উপকরণ প্রাইজবন্ডের সার্বিক লেনদেনে ধারাবাহিক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নতুন বিক্রির মাধ্যমে যে অর্থ সংগ্রহ হচ্ছে, তা দিয়ে আগে বিক্রি করা বন্ডের দায় পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারের অন্য হিসাব থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের টাকা শোধ করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, নতুন বিক্রি ও আগের বন্ড ভাঙানোর মধ্যে পার্থক্য দিন দিন বাড়ছে।
প্রাইজবন্ড মূলত একটি সঞ্চয়ী উপকরণ হিসেবে চালু করা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের প্রবণতা তৈরি করা। প্রাথমিক পর্যায়ে এ খাতে সাড়া ভালো থাকলেও বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের আগ্রহ কমেছে। এর অন্যতম কারণ, প্রাইজবন্ডে কোনো মুনাফা দেওয়া হয় না। প্রতি তিন মাসে একটি করে লটারি ড্র অনুষ্ঠিত হয় এবং কেবল পুরস্কারজয়ী বন্ডেই অর্থ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, সরকারি অন্যান্য সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা পাওয়া যায়, যা এখন সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। ফলে গ্রাহকেরা সহজেই ঘরে বসে মুনাফা পাচ্ছেন। কিন্তু প্রাইজবন্ডে এই সুবিধা নেই।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রাইজবন্ডে গ্রাহকদের বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ১৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। ওই মাসে নতুন বিক্রি ও ভাঙানো বন্ডের মধ্যে ঘাটতি ছিল ২০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
ঘাটতির এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে স্থিতি ছিল ১০ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ঘাটতি ছিল ১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে ঘাটতি ছিল ২০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে জানুয়ারিতে স্থিতি ছিল ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং ঘাটতি ছিল ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে ঘাটতি ছিল ১৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ঘাটতি ছিল ১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এভাবে প্রতিটি অর্থবছরে ঘাটতি স্থায়ীভাবে বাড়ছে।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে স্থিতি ছিল ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং ঘাটতি ছিল ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরে জুলাই-জানুয়ারিতে ঘাটতি দাঁড়ায় ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ঘাটতি ছিল ১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা, আর ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে ১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২২ সালে জানুয়ারিতে ঘাটতি ছিল ১৩ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঘাটতি ছিল ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ওই অর্থবছরে জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে জানুয়ারিতে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
তবে সব সময় ঘাটতি হচ্ছে না। বিশেষ করে লটারি ড্রয়ের আগে প্রাইজবন্ড বিক্রি বাড়ায় কিছু মাসে উদ্বৃত্ত থাকে। যেমন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উদ্বৃত্ত ছিল ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, নভেম্বরে ২৫ কোটি ৪০ লাখ, অক্টোবরে ১৬ কোটি ৯০ লাখ এবং সেপ্টেম্বরে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে এই প্রবণতা স্থায়ী নয়। লটারির সময় পেরিয়ে গেলে বিক্রি কমে যায় এবং আবার ঘাটতি তৈরি হয়।
বর্তমানে বাজারে কেবল ১০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড পাওয়া যাচ্ছে। আগে বিভিন্ন মূল্যের প্রাইজবন্ড পাওয়া যেত এবং উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্যও এর প্রচলন ছিল। বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংকে এটি বিক্রি হয়। তবে সব ব্যাংক ও ডাকঘরে প্রাইজবন্ড পাওয়া যায় না। ড্রয়ের সময় দুই মাসের কম থাকলে নতুন বিক্রিও কমে যায়। তখন অনেকেই কাউন্টারের সামনে অপেক্ষা করেন—কেউ যদি পুরনো বন্ড ফেরত দেয়, তা কেনার জন্য।
বছরে চারবার প্রাইজবন্ডের লটারি অনুষ্ঠিত হয়—৩১ জানুয়ারি, ৩০ এপ্রিল, ৩১ জুলাই ও ৩১ অক্টোবর। ড্র তারিখের দুই মাস আগে কেনা বন্ডগুলোই সংশ্লিষ্ট ড্রয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে ড্রয়ের আগে বিক্রি বাড়ে এবং পরে কমে যায়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের আগ্রহ না থাকায় প্রাইজবন্ড মূলত লটারিতে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কেনা হচ্ছে। এর ফলে প্রাইজবন্ডে স্থায়ী বিনিয়োগ তৈরি হচ্ছে না, যা এই সঞ্চয়ী উপকরণের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২০ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

