অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশের বীমা খাতে প্রিমিয়াম সংগ্রহে গতি থাকলেও দাবি পরিশোধে সেই অগ্রগতি প্রতিফলিত হয়নি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে দেশের বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আদায় করলেও এর বিপরীতে দাবি হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট আয়ের অর্ধেকেরও কম—প্রায় ৪৮ শতাংশ—দাবি নিষ্পত্তিতে ব্যয় হয়েছে। এই ব্যবধান ক্রমেই বাড়তে থাকায় বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। আলোচ্য সময়ে সার্বিক দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে জীবন বীমা খাতে নিষ্পত্তির হার তুলনামূলক ভালো হলেও সেটিও আশানুরূপ নয়—৩৫.১৮ শতাংশ। অন্যদিকে নন-লাইফ বীমা খাতে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক; এখানে দাবি নিষ্পত্তির হার নেমে এসেছে মাত্র ৭.৫৫ শতাংশে। সব মিলিয়ে বর্তমানে পুরো বীমা খাতে বকেয়া দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, যা খাতটির আর্থিক স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত প্রিমিয়াম দেওয়ার পরও সময়মতো দাবি পরিশোধ না হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও গ্রাহকদের মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে পাওনা অর্থের জন্য। এর ফলে বীমাকে আর নিরাপদ আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে না দেখে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাজারের জন্য হুমকিস্বরূপ।

আন্তর্জাতিকভাবে একটি বীমা কোম্পানির আর্থিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ইনকার্ড ক্লেইম রেশিও (আইনিআর)। সাধারণভাবে ৬০ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে এই অনুপাত থাকলে সেটিকে ইতিবাচক ধরা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বহু বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে এই হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে কোম্পানিগুলো কাগুজে মুনাফা দেখাতে পারলেও গ্রাহকদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, ম্যাচিউরড পলিসির অর্থ পরিশোধে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করছে।

সাবেক বীমা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রিমিয়ামের অর্থ যদি দাবি পরিশোধে ব্যবহার না হয়, তবে তা লাইফ ফান্ড বা নিরাপদ বিনিয়োগে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রে লাইফ ফান্ড ও বিনিয়োগ উভয়ই কমতে দেখা যাচ্ছে, যা তহবিলের অপব্যবহার, দুর্বল ব্যবস্থাপনা কিংবা স্বচ্ছতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় শেষ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।

এই প্রেক্ষাপটে খাতটিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইডিআরএ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নন-লাইফ বীমা খাতে ব্যক্তিগত এজেন্টদের কমিশন শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তাঁদের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সুশাসন জোরদার হবে, দাবি নিষ্পত্তির গতি বাড়বে এবং ধীরে ধীরে গ্রাহকদের আস্থা ফিরতে শুরু করবে। এর ইতিবাচক প্রভাব আগামী দিনে বীমা খাতে নগদ প্রবাহ স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অকা/বীখা/ই/দুপুর/২৫ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 days আগে

Leave A Reply

Exit mobile version