নিজস্ব প্রতিবেদক
সাম্প্রতিক বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পাশাপাশি অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী-খাল-জলাশয় দখল, পাহাড় কাটা এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্মিলিত ফল। তাই কেবল ত্রাণ নয়, বন্যার মূল কারণ নিরসনে বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)।
শনিবার (১৮ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে অনুষ্ঠিত "সাম্প্রতিক বন্যার তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা" শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ধরার সহ-আহ্বায়ক এম. এস. সিদ্দিকী। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ধরা’র সদস্য সচিব শরীফ জামিল এবং সঞ্চালনা করেন রিভার বাংলা এর সম্পাদক ও ধরা’র সদস্য ফয়সাল আহমেদ।
সংবাদ সম্মেলনের সভাপতির বক্তব্যে এম. এস. সিদ্দিকী বলেন, সাম্প্রতিক বন্যা শুধু প্রাকৃতিক কারণে নয়; অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী-খাল ভরাট, পানি প্রবাহে বাধা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে এর ভয়াবহতা বেড়েছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা, জুলাই ৬-১৬ তারিখের পাঁচটি জাতীয় পত্রিকার তথ্যের ভিত্তিতে ধরা একটি পর্যালোচনা প্রস্তুত করেছে। তিনি বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি বন্যা ব্যবস্থাপনায় ব্যক্তি স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল বক্তব্যে শরীফ জামিল বলেন, চলতি বছরের ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা অতি ভারী বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির ফলে দেশের অন্তত ১৭টি জেলা ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছে। এতে ১০ লক্ষের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চট্টগ্রামে প্রায় ৬ লাখ, কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজার, রাঙামাটিতে ১ লাখ ৮ হাজার, বান্দরবানে ৮৩ হাজার ৫০০ এবং কুড়িগ্রামে ১ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি, হাজারো মাছের ঘের, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, এ বন্যা শুধু অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলের ফল নয়; নদী-খাল-জলাশয় দখল, নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ২০২৩ থেকে শুরু করে ২০২৬ এর জুলাই পর্যন্ত যত বন্যা ও জলাবদ্ধতা হয়েছে তাঁর সিংহভাগ দায় চট্টগ্রাম- কক্সবাজার রেল লাইনের। তিনি নদী অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা, আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্রুত পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
হাওর রক্ষায় আমরা-ধরা’র আহ্বায়ক জাফর সিদ্দিক বলেন, “বন্যা বাংলাদেশে নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত প্রস্তুতি, দ্রুত লজিস্টিক সহায়তা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন ধরা’র সদস্য ও শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, দুর্যোগকবলিত এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে চুনতি রক্ষা আন্দোলন-ধরা’র সমন্বয়ক সানজিদা রহমান, কক্সবাজার ধরার সদস্য ফরিদুল আলম শাহিন এবং মাতামুহুরী ধরার সদস্য বদরুননাহার কলি উপস্থিত থেকে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতি নদী অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার, পরিবেশসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ধরা'র নেতৃবৃন্দ, পরিবেশ আন্দোলনের প্রতিনিধি, গবেষক, উন্নয়নকর্মী এবং বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 hour আগে

