অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গত অর্থবছরে মুনাফার তুলনায় বেশি নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এ প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি বাংলাদেশ থেকে ধীরে ধীরে মূলধন প্রত্যাহারের কৌশল? বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দেশের জন্য উদ্বেগজনক এবং দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি ও পুঁজি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ৯টি প্রতিষ্ঠান মুনাফার চেয়ে বেশি পরিমাণ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। যৌথভাবে তাদের নিট মুনাফা ছিল ৮ হাজার ১৬৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। কিন্তু ঘোষিত নগদ লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭৯৪ কোটি ৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ মুনাফার তুলনায় লভ্যাংশ বেড়েছে ১ হাজার ৬২৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, ডলার সংকটের কারণে বিগত কয়েক বছর বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা দেশে পাঠাতে পারেনি। এখন যখন ডলার পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল, তখন একসঙ্গে বড় অঙ্কের লভ্যাংশ পাঠানো হচ্ছে। এতে মুনাফার চেয়ে বেশি লভ্যাংশ ঘোষণার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ডলার সংকটের কারণে পূর্ববর্তী বছরগুলোর লভ্যাংশ আটকে ছিল। এখন সংকট কমেছে বলে তারা পুরনো লভ্যাংশও নিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর টাকার অবমূল্যায়ন গত কয়েক বছরে প্রায় ৫০ শতাংশ হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতে আরও অবমূল্যায়ন হতে পারে, তাই তারা দ্রুত মুনাফা ফেরত পাঠাচ্ছে।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে এখনো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তারা পুনর্বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত তাদের গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজির ওপর নির্ভর করে। তবে আমাদের ব্যর্থতা হলো আমরা বিনিয়োগের পরিবেশ এত আকর্ষণীয় করতে পারিনি যে তারা পুনর্বিনিয়োগে উৎসাহী হবে।’
এসএআর সিকিউরিটিজের এমডি শরীফ আতাউর রহমান বলেন, ‘তারা বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও ইল্ড হিসেবে হিসাব করলে তা তেমন লাভজনক নয়। যেমন—৩০০ টাকার শেয়ারে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশে প্রকৃত রিটার্ন সীমিত। মূল উদ্দেশ্য নগদ টাকা ফেরত নেওয়া।’
গ্রামীণফোন সর্বাধিক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটি ৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে ৪ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকার লভ্যাংশ দিয়েছে। ম্যারিকো বাংলাদেশ তুলেছে ৬১৯ কোটি টাকা, লাফার্জহোলসিম ১১৩ কোটি টাকা। রবি, রেকিট বেনকিজার, সিঙ্গার, আরকে সিরামিকস, লিন্ডে বিডি ও ইউনিলিভারও মুনাফার চেয়ে বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তবে বিএটিবিসি, বার্জার পেইন্টস, বাটা শু ও হাইডেলবার্গ সিমেন্ট কিছুটা সংযত ছিল, যদিও তাদের প্রবণতাও প্রায় একই।
ম্যারিকো বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব শাহিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা লভ্যাংশ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘোষণা করেছি। কোম্পানির রিটেইন্ড আর্নিংস এবং ক্যাশ ফ্লো পর্যাপ্ত আছে।’
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বলেছে, কোম্পানির লভ্যাংশ বা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। সংস্থার মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, ‘কোনো কোম্পানি বিনিয়োগ করবে কি না, সেটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।’
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশ কি কেবল মুনাফা তুলে নেওয়ার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে? যদি দেশে প্রবৃদ্ধির সুযোগ থাকে, তবে পুনর্বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া এখন সময়ের দাবি। ●
অকা/পুঁবা/ই/দুপুর/২৬ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

