অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন—এই তিনটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইএসজি (ESG) রিপোর্টিং গত এক দশকে বৈপ্লবিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় যা ছিল স্বেচ্ছামূলক করপোরেট চর্চা, এখন তা উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির শেয়ার বাজারগুলোতে বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামোর অংশ। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ, ইউরোনেক্সট ও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্টক এক্সচেঞ্জের মতো প্রধান ইউরোপীয় বাজারের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর ও ভারতের শেয়ার বাজারেও ইএসজি রিপোর্টিং এখন আর ঐচ্ছিক নয়—এটি বিনিয়োগযোগ্যতার একটি মৌলিক শর্ত।

এই বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে ইএসজি রিপোর্টিং এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং মৌলভিত্তি শক্তিশালী দেশীয় কোম্পানি সীমিত আকারে পরিবেশ বা সামাজিক দায়বদ্ধতার তথ্য প্রকাশ করলেও, নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে এখনো কার্যকর ও বাধ্যতামূলক কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে এই চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন, অসম্পূর্ণ এবং ধারাবাহিকতাহীন থেকে যাচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি বিনিয়োগের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা। নীতিমালার ঘনঘন পরিবর্তন, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক ইএসজি মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকার বিষয়টিকেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। এই প্রেক্ষাপটে বাজারে আস্থা ফেরানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ইএসজি আর বিলাসী ধারণা নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি।

এরই মধ্যে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ১৬টি কোম্পানি ব্লুমবার্গ ইএসজি ইউনিভার্সে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে গ্রামীণফোন, বিএটি বাংলাদেশ, মারিকো বাংলাদেশ, ব্র্যাক ব্যাংক, আইডিএলসি ফাইন্যান্স, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ওয়ালটন হাইটেক, লাফার্জহোলসিম, এমজেএল বাংলাদেশ, বিএসআরএম, লিন্ডে বাংলাদেশ, রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ, সিঙ্গার বাংলাদেশ, হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশ, রবি আজিয়াটা ও সিটি ব্যাংক। যদিও সংখ্যাটি এখনো সীমিত, তবু এটি ইঙ্গিত দেয় যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তরণের পথে কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছে।

এলডিসি উত্তরণ–পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের তাগিদে ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর মধ্যেও ইএসজি নিয়ে তৎপরতা বাড়ছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ইএসজি উন্নয়ন ও নীতিগত প্রস্তুতির জন্য ইতোমধ্যে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে, যা বেসরকারি খাতের মধ্যে সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

যদিও দেশে এখনো ইএসজি রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক নয়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ গ্লোবাল রিপোর্টিং ইনিশিয়েটিভ (জিআরআই)-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে, যাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী টেকসইতা প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে প্রতিবেদন তৈরি করলেও সেই চর্চা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পারেনি।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, শেয়ার বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদারে ইএসজি রিপোর্টিংকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে কমিশন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তাঁর মতে, বিদ্যমান করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডে ইএসজি বিষয়গুলো আংশিকভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এ কারণে কোড সংশোধনের মাধ্যমে ইএসজি রিপোর্টিংকে আরও শক্ত, স্পষ্ট ও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত হস্তক্ষেপ ইতোমধ্যে আর্থিক খাতে ইএসজি ধারণার প্রভাব দেখাতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (ইএসআরএম) নির্দেশনা এবং ২০২০ সালের টেকসই অর্থায়ন নীতিমালার ফলে ব্যাংকগুলো এখন পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর ফল হিসেবে সবুজ ও টেকসই অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা এবং টেকসই অর্থায়ন প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা, যা যথাক্রমে ২১ শতাংশ ও ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক পুঁজি বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত হতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে ইএসজি রিপোর্টিংকে আর বিলম্বিত করার সুযোগ নেই। এখন প্রয়োজন নীতিগত দৃঢ়তা, বাধ্যতামূলক কাঠামো এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন—যার মাধ্যমেই ইএসজি কাগুজে অঙ্গীকার থেকে কার্যকর বাজার-বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।

অকা/পুঁবা/ই/সকাল/২০ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 1 week আগে

Leave A Reply

Exit mobile version