অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন অনিশ্চয়তা ও মন্দার চাপ স্পষ্ট, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই তিন মাসে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১৫ দশমিক ০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল মাত্র ১০৪ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট এফডিআই প্রবাহে প্রায় ২০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থায় উল্লেখযোগ্য পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরেছে।

শুধু একটি প্রান্তিক নয়, বরং পুরো বছরের সামগ্রিক হিসাবেও বিদেশি বিনিয়োগের গতি স্পষ্টভাবে ঊর্ধ্বমুখী। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর) দেশে মোট নিট এফডিআই প্রবাহ পৌঁছেছে প্রায় ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৭৮০ মিলিয়ন ডলার, ফলে নয় মাসে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশে। এই সময়কালে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ৩১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০১ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে পুনঃবিনিয়োগকৃত আয় বা রিইনভেস্টেড আর্নিংস। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৯০ শতাংশেরও বেশি, যা ইঙ্গিত দেয়—বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু নতুন করে বিনিয়োগই করছে না, বরং বাংলাদেশে অর্জিত মুনাফা দেশেই পুনরায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

এফডিআইয়ের অন্যান্য উপাদানেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ বা ইন্ট্রা-কোম্পানি লোন খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি এসেছে। যেখানে আগের বছর এই খাতে ৪৫ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ডলারের ঋণাত্মক প্রবাহ দেখা গিয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে তা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলারের ইতিবাচক অবস্থানে পৌঁছেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বছরের প্রথম ছয় মাসেও এই ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল, যখন নিট এফডিআই প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় ৬১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়।

এই সাফল্য নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর একটি কার্যকর পাইপলাইন তৈরি করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। তার ভাষায়, এখন সেই পাইপলাইন থেকে বাস্তব বিনিয়োগ দেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, টানা দুই প্রান্তিকে এফডিআই প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজার ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী।

তবে তিনি সতর্ক করে জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর–ডিসেম্বর) বিনিয়োগের গতি সাময়িকভাবে কিছুটা শ্লথ হতে পারে। তা সত্ত্বেও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ আবারও জোরালো গতি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বর্তমানে বিডার বিনিয়োগ পাইপলাইনে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি প্রস্তাব জমা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এফডিআই প্রবাহ আরও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অকা/প্র/ই/সকাল/১২ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 days আগে

Leave A Reply

Exit mobile version