অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
২০২০ সাল শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত (ক্যাপিটাল টু অ্যাসেট রেশিও) নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে। এক দশক ধরেই ব্যাংকের মৌলিক এ সূচকের অবনমন হয়েছে। ২০১১ সালেও ব্যাংকের সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংকের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মূলধনের এ দৈন্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যাংকের প্রধান ভিত্তি হলো তার মূলধন। যে ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা যত বেশি অর্থনৈতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সে ব্যাংকের সক্ষমতা ততটাই শক্তিশালী। আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা, ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা পরিমাপের প্রধান মাপকাঠি হিসেবেও বিবেচনা করা হয় মূলধনকে। যদিও এ মূলধনের দিক থেকেই বিশ্বের ছোট-বড় প্রায় সব দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত।
বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশেই ব্যাংক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ অনুপাত ৮ দশমিক ১ শতাংশ। পাকিস্তানে ব্যাংক সম্পদ-মূলধনের অনুপাত ৭ দশমিক ২ শতাংশ। চীনে এ অনুপাত ৯ দশমিক ২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের ব্যাংক খাতের মূলধন সক্ষমতাও বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ব্যাংক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত নেপালে ১০ দশমিক ৬, ভুটানে ১২ দশমিক ২ ও মালদ্বীপে ২২ দশমিক ২ শতাংশ।
বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার ব্যাংক খাতের মূলধন সক্ষমতা অনেক ভালো। এর মধ্যে থাইল্যান্ডে ব্যাংক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত ১১ দশমিক ১ শতাংশ। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৭ দশমিক ৮ ও ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থানে থাকা শ্রীলংকার ব্যাংক খাতের সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত এখনো ৮ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি। আর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ১১ ও ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
আমানতকারীদের অর্থ থেকে গ্রাহকদের যে ঋণ দেয়া হয়, সেটি ব্যাংকের প্রধান সম্পদ। অন্যদিকে মূলধন হলো ব্যাংকের উদ্যোক্তা তথা শেয়ারহোল্ডারদের জোগান দেয়া পরিশোধিত মূলধন, বিভিন্ন ধরনের রিজার্ভ ও রিটেইন আর্নিংস। বিশ্বব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, গত এক দশকে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ব্যাংক খাতে সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূলধন বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে দ্রুতগতিতে সম্পদ বাড়লেও সে অনুপাতে মূলধন না বেড়ে উল্টো কমেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মূলধনের নাজুক পরিস্থিতির কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করছেন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরাও। তারা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক উদ্যোক্তারা মূলধন সক্ষমতা বাড়াতে নিজের অর্থ ব্যয় করতে চান না। বিপরীতে প্রতি বছরই মুনাফা থেকে বড় অংকের নগদ লভ্যাংশ বের করে নিতে উদগ্রীব থাকেন। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও চাইছে ব্যাংকগুলো নগদ লভ্যাংশ দিক। এছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন ব্যাংকের জন্ম হওয়ায় ব্যাংকগুলোর পক্ষে মূলধন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে এখনো ৪০০ কোটি টাকা মূলধন দিয়ে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে। আগে এর চেয়েও অনেক কম মূলধন দিয়ে ব্যাংকের জন্ম হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মূলধন কাঠামোয় দুর্বলতা থেকে গেছে। নতুন ব্যাংকগুলো দ্রুতগতিতে ব্যবসায়িক পরিধি বড় করছে। এ কারণে ব্যাংক খাতের মূলধন না বাড়লেও সম্পদ বড় হচ্ছে। তবে একটি স্থিতিশীল ব্যাংক ব্যবস্থার জন্য ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা ছিল ব্যাংকগুলোর মূলধন ও শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১। এর মধ্যে অন্তত ১০টি ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি খুবই নাজুক। দেশের অন্তত অর্ধেক ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা সন্তোষজনক মাত্রায় নেই।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও যেকোনো ব্যাংকের মূলধনের পরিমাপক হলো মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর)। যদিও এক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যাংক। পরিসংখ্যান বলছে, মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাতের দিক থেকে উন্নত দেশগুলোর ব্যাংকের তুলনায় বহু পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও এক্ষেত্রে দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থান একেবারেই তলানিতে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী, ২০১৯ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতের সিএআর হওয়ার কথা সাড়ে ১২ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এখনো এটি ১১ শতাংশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও পাকিস্তানে এ অনুপাত ১৭, শ্রীলংকায় ১৬ দশমিক ৫০ ও ভারতে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ।
সিএআরকে ঝুঁকিবারিত সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের অনুপাত বা ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেট রেশিও (সিআরএআর) বলেও অভিহিত করা হয়। বৈশ্বিকভাবে ব্যাংকের সক্ষমতা পরিমাপের অন্যতম মানদণ্ড ধরা হয় এ অনুপাতকে। আর্থিক দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের সময় ব্যাংক কতটা শক্ত ও ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবে, এটি তারই নির্দেশক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সম্পদের বিপরীতে মূলধন সক্ষমতার হার কম থাকার অর্থই হলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো দুর্বল। মূলধন হলো যেকোনো ব্যাংকের প্রধান ভিত। এটি দুর্বল হলে ব্যাংক যত বড়ই হোক না কেন, সেটি টেকসই হবে না। যে ব্যাংকের মূলধন কম সে ব্যাংকে আমানতকারীদের অর্থ বেশি ঝুঁকিতে। ব্যাংক খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য মূলধন বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে উদ্যোগী হতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম মনে করেন, দেশের ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো যাতে ইচ্ছেমতো নগদ লভ্যাংশ দিতে না পারে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে এর আগে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে। নতুন ব্যাংক অনুমোদনের বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক।
#
অকা/ব্যাংখা/রাত, ৫ এপ্রিল, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

