অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের আর্থিক বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি সরকারি ঋণপত্র—ট্রেজারি বিলের সুদের হার আবারও বাড়তে শুরু করেছে, যা সামগ্রিক সুদের হার কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলছে।
মূলত সরকারের অর্থের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সরকার তার ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ট্রেজারি বিলের মুনাফার হারের ওপর, যা গত এক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সর্বশেষ নিলামের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৯১ দিন, ১৮২ দিন এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার ৩১ থেকে ৩৩ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদের হার দাঁড়িয়েছে ১০.১৬ শতাংশে। একইভাবে ১৮২ দিনের ক্ষেত্রে এই হার ১০.৩৩ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিনের ক্ষেত্রে ১০.৩৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এক সপ্তাহ আগেও এই হারগুলো তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সুদের হার বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট করে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। রাজস্ব আয়ে ঘাটতি থাকায় সরকারের কোষাগারে অর্থের চাপ তৈরি হয়েছে, ফলে তারা বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এমনকি নিয়মিত নিলাম সূচির বাইরে গিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত নিলামের আয়োজন করেছে, যেখানে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
যদিও কিছুদিন আগে ট্রেজারি বিলের সুদের হার ১১.৫ শতাংশের ওপরে উঠে গিয়েছিল, পরে ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তা কমে আসে। কিন্তু বর্তমানে সরকারের বাড়তি ঋণ চাহিদার কারণে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি এই প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের ফলে সরকারি ব্যয় বেড়েছে, যা অর্থের চাহিদা বাড়িয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সুদের হারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা করেছেন যে, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার মূলত ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। যখন ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকে, তখন সুদের হার কম থাকে। কিন্তু সরকারের ঋণ চাহিদা বেশি হলে এবং সেই তুলনায় তারল্য কম থাকলে সুদের হার বেড়ে যায়।
বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের তারল্য সংকট না থাকলেও সরকারের উচ্চ ঋণ চাহিদাই সুদের হার বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই প্রবণতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে, যা বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ৯১ দিন, ১৮২ দিন এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে আরও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, ট্রেজারি বিল হলো স্বল্পমেয়াদি সরকারি ঋণপত্র, যার মেয়াদ সাধারণত ৯১ দিন থেকে ৩৬৪ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ সরকার নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করে। অন্যদিকে, ট্রেজারি বন্ড দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্র, যার মেয়াদ ২ বছর থেকে ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ এবং রাজস্ব ঘাটতির কারণে ট্রেজারি বিলের সুদের হার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা শুধু সরকারি অর্থব্যবস্থাই নয়, বরং পুরো অর্থনীতির ওপরই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১৩ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

