প্রণব মজুমদার

শূন্য অবস্থায় রয়েছে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান পদটি। কদিন আগে পদত্যাগ করেছেন বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক ড. এম আসলাম আলম। বেশ কয়েকদিন আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর অফিস ছেড়ে চলে যান। তবে তার চলে যাওয়টা সুখকর হয়নি। রাষ্ট্রয়ত্ত আর্থিক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানেই শীর্ষ পদে পরিবর্তন হয়েছে। সামনে আরো হবে।

অর্থনীতির প্রাণ হলো ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কোনটাই সুস্থ নেই! দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের আর্থিক খাতের দুরাবস্থা বেশ সময় ধরে। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে প্রায় শেষ হয়ে গেছে নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (লিজিং কোম্পানি)। ব্যাংকের হতশ্রী অবস্থা বেশ কবছর থেকেই। গ্রাহকদের পাওনা না পাওয়ায় অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতায় নিমজ্জিত দেশের বীমা কোম্পানিগুলো। প্রায় সাড়ে ৩ দশক ধরে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতিকরণ এবং নিজেদের পছন্দের লোকজনদের নিয়োগ করে রীতিমত লুটপাট করা হয়েছে! ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য সরকারের ঘনঘন পরিবর্তনশীল নীতিও দায়ী। বাস্তবতা হলো, নতুন সরকারে নিয়োগ হয় পছন্দের ব্যক্তি তিনি অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্য বুজুক বা না বুজুক! সরকার পরিবর্তন হলে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য ব্যক্তি থাকলেও তাকেও সরে যেতে হয়! তার গৃহীত পরিকল্পনা ও নীতি পরিবর্তন বা বাদ দেওয়া হয়। এতে করে যে অর্থের অপচয় হয় সেটা দেশের জনগণকেই বহন করতে হয়।

দেশের অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক অনুকূলে নেই! ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক খাতের পরিসংখ্যান চিত্র উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংক এর পরিসংখ্যান বলছে হতাশার কথা। ব্যাংকগুলোর ৫ হাজার ৭৭৫ গ্রাহকের কাছে ৩ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। ২০২৫ সালের জুন অবধি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায় যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৪ শতাংশের বেশি। এটি গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বেচ্চ এবং বিশ্বব্যাপি খেলাপির হার বিবেচনায়ও অন্যতম শীর্ষ। বড় শিল্প গোষ্ঠীর ব্যাংক ঋণে খেলাপির হার ৫১ শতাংশের উপরে। দিন দিন বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এরমধ্যে একীভত ৫টি ইসলামী ব্যাংকের লেনদেন ও কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি।

২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে জীবন ও সাধারণ বীমা খাতে হাজার কোটি টাকারও বেশি দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর তথ্যনুয়ায় ২০২৪ সাল অবধি লাইফ বীমায় প্রায় ৪৩৭৫ কোটি টাকা এবং নন-লাইফ খাতে প্রায় ২৬৩৫ কোটি টাকা থেকে ৩৩০০ কোটির বেশি দাবি অনিষ্পন্ন। ফারইস্ট লাইফ এবং গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের মতো কোম্পানিগুলো উচ্চ অনিষ্পন্ন দাবির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। অনিষ্পন্ন বীমা দারি ৯০ শতাংশই ঝুলে আছে। ১৮টি লাইফ বীমার কার্যক্রম প্রায় অচল।

অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৯০০ কোটি টাকা। তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক এর। দুমাস আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক ৬টি অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নরের বিদায়টা মোটেও সুখকর হয়নি। গভর্নর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর কর্মস্থল ত্যাগ করলেন অনভিপ্রেত ঘটনার মধ্য দিয়ে। তাঁর উপদেষ্টাকেও মব সৃষ্টি করে বিতাড়িত করা হয়েছে! দেশের অর্থনীতির প্রাণ বলে বিবেচিত বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রধান থাকেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অর্থনীতি বিষয়ের প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। সব সৃষ্টি করে গভর্নরের বিতাড়নের আচরণ কেউই ভালো চোখে দেখেনি!

খেলাপি ঋণের আধিক্য অর্থনীতির ককর্টরোগ। এ খেলাপি ঋণ সব খাতে সমান নয়। কৃষি খাতে তুলনামূলকভাবে খেলাপির হার কম, কারণ সরকার কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা দেয় এবং ঋণের পরিমাণও তুলনামূলক কম। খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি শিল্প ও করপোরেট খাতে। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী প্রভাব খাটিয়ে হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ফেরত দেয় না। এসএমই খাতে ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, সুদের হার ও বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খেলাপি হয়ে পড়ে। ভোক্তা ঋণে খেলাপির সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষত আবাসন ও গাড়ি ঋণে।

বাংলাদেশে ঋণ খেলাপি হওয়ার মূল কারণগুলোর অন্যতম দুর্বল ঋণ সংস্কৃতি। এখানে ঋণকে একটি দায় হিসেবে নয়; বরং সুযোগ হিসেবে দেখা হয়।  প্রভাবশালীরা ধরেই নেন যে, ঋণ পরিশোধ না করলেও তাকে কেউ ধরতে পারবে না। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগের কারণে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ থাকে না। যোগ্যতা ও প্রকল্পের সম্ভাবনা না দেখে শুধু সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হয়। ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকলেও মামলার জট, দীর্ঘসূত্রতা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর কারণে সেগুলো কার্যকর নয়। ফলে শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিকবার পুনঃতফসিলের অনুমতি দিয়েছে, যার ফলে খেলাপি ঋণকে কাগজে-কলমে সুস্থ ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে সমস্যা আড়াল হলেও বাস্তবে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে।

হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে ব্যাংক লুটপাট ও খেলাপি ঋণের বিস্তার ঘটে। বিশেষ করে, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ এবং পাচারের ঘটনা সঙ্কট আরো জটিল করে। খেলাপি ঋণের প্রভাব কেবল ব্যাংক খাতেই সীমাবদ্ধ এমন নয়। এটি পুরো অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। কারণ, ব্যাংকের মূলধন সঙ্কুচিত হয়, ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমে যায়। বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন শিল্প হয় না, কর্মসংস্থান হয় না। খেলাপি ঋণের কারণে সুদের আয় না হওয়ায় ব্যাংকের আয় কমে, লোকসানে পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি। ফলে সরকারকে অর্থ দিয়ে সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, যা জনগণের অর্থের অপচয়। সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে জনগণের আস্থায়। যখন সাধারণ মানুষ দেখে প্রভাবশালীরা হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ না করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তারা ব্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। খেলাপি ঋণের কারণে একদিকে প্রভাবশালী ধনী গোষ্ঠী আরো ধনী হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ব্যাংকের সহায়তা না পেয়ে পিছিয়ে পড়ে। ফলে সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়।

ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, গ্রীস ও ইতালি কোনো না কোনো সময়ে খেলাপি ঋণের সঙ্কটে পড়েছে। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সঙ্কটের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে। সরকার দ্রুত ‘কোরিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন’ নামে একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর অকার্যকর ঋণ কিনে নেয়া হয় এবং ধাপে ধাপে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালানো হয়। এই পদক্ষেপ শুধু ব্যাংক খাতকে স্বস্তি দেয়নি; বরং দ্রুত বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারেও সাহায্য করেছিল। চীনের ব্যাংক খাত টিকিয়ে রাখতে একাধিক ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়; যেগুলো খেলাপি ঋণ আলাদা করে নিয়ে তা পুনর্গঠন বা বিক্রি করার কাজ করে। এর ফলে ব্যাংকগুলো নতুন করে কার্যক্রম শুরু করতে পারে এবং আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা ফিরে আসে। ভারত ২০১৬ সালে  ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি কোড’ প্রণয়ন করে, যা খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আইনি কাঠামো দেয়। এর মাধ্যমে ঋণগহীতা যদি সময়মতো দায় শোধ করতে ব্যর্থ হয়, তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার সম্পদ পুনর্গঠন বা নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা নেয়া হয়। এর ফলে ভারতে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের হার বাড়তে শুরু করেছে।

এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি মূল শিক্ষার বিষয় আছে। খেলাপি ঋণকে যত দ্রুত আলাদা করে সমাধান করা যায়, ততই ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের সুযোগ পায়। আইনি কাঠামো শক্তিশালী বা সুশাসন নিশ্চিত না হলে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যত অসম্ভব। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এই প্রক্রিয়া চালাতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হয় না এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে আবারো ঋণ খেলাপি হবে।

আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে বলে আসছে, ব্যাংক খাতের সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। আইএমএফের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে ‘স্ট্রাকচারাল রিস্ক’-এর মুখে আছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হবে। সুতরাং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি ব্যবহার খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। অনেক ঋণ খেলাপি বিদেশে সম্পদ স্থানান্তর করেন। সে অর্থ উদ্ধারের জন্য আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারাবে।

নতুন সরকার এসেছে। দেশের সর্বোচ্চ আইন সভা জাতীয় সংসদের অধিবেশন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। উন্নয়নের যাত্রায় দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোই চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুচারুভাবে পরিচালনা করার জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রণকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তির বিকল্প নেই। রাজনৈতিক নিয়োগ পরিহার করতে হবে। বাজারের আকার অনুযায়ী কোম্পানির সংখ্যা কমাতে বা একিভূত করতে হবে। অবসায়নের প্রক্রিয়ায়ও যেতে হবে।

অকা/নিলে/ই/সকাল/১৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ 

লেখক কথাসাহিত্যিক, কবি ও অর্থকাগজ সম্পাদক

reporterpranab@gmail.com

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version