অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার ক্ষত এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সংঘটিত লুটপাটের প্রভাব ধীরে ধীরে আর্থিক সূচকগুলোতে প্রকট আকার ধারণ করছে। তারল্য পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সহনীয় থাকলেও মূলধন, সম্পদের মান, ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা ও আয়—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই অবনতি দেখা যাচ্ছে। ফলে ব্যাংক খাত সামগ্রিকভাবে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ত্রৈমাসিক আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার কমেছে এবং সম্পদের মান আরও দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ও খেলাপি ঋণ বাড়ায় আয়যোগ্য সম্পদের পরিমাণ কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর আয়ের ওপর।

খেলাপি ঋণের চাপ বাড়তে থাকায় সুদ আয় কমেছে এবং তার ফল হিসেবে গত বছরের মার্চ থেকে অধিকাংশ ব্যাংকেই লোকসানের প্রবণতা জোরালো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাত সামগ্রিকভাবে লাভজনক অবস্থায় থাকলেও চলতি বছরে এসে চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করে। মার্চে মূলধনের বিপরীতে লোকসান ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশে। একই সময়ে সম্পদের বিপরীতে লোকসানের হার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশে পৌঁছেছে, যদিও জুনের তুলনায় সেপ্টেম্বরে লোকসানের হার সামান্য কমেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক খাতের কর্মক্ষমতা ছিল মিশ্র। ঋণপ্রবাহ বাড়ায় মোট সম্পদ বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ, যা প্রবৃদ্ধির দিক থেকে খুবই সীমিত। বিপরীতে খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে সম্পদের মান আরও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। কিছু ভালো ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণ বাড়ালেও সামগ্রিক প্রভিশন ঘাটতি কমেনি; বরং তা আরও বেড়েছে। গত জুনে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়। এই বিপুল ঘাটতি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝুঁকিকে আরও গভীর করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতিতে করা চাপ পরীক্ষায় দেখা গেছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাত সম্ভাব্য আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, শীর্ষ দুটি বড় ঋণগ্রহীতা যদি নতুন করে খেলাপিতে পরিণত হয়, তাহলে মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হবে। এর ফলে খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়বে এবং জামানতের মান আরও নেমে যাবে।

তারল্য পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ কম নয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ১৮টি ব্যাংক টানা পাঁচ দিন বড় অঙ্কের অতিরিক্ত আমানত উত্তোলনের চাপ সহ্য করতে পারবে না। আর্থিক ক্ষতি ও ঋণমানের অবনতির কারণে এসব ব্যাংক এখনো টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রার কেন্দ্রীকরণ। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেসব ব্যাংকে বড় ধরনের লুটপাট ও অনিয়ম হয়েছে, সেখানেই খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বর্তমানে মোট খেলাপি ঋণের ৬৯ শতাংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে। এর মধ্যে আবার পাঁচটি ব্যাংকের দখলেই রয়েছে ৪৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ। এই অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ পুরো ব্যাংক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং ঝুঁকিকে আরও সংক্রমণযোগ্য করে তুলছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি জোরদার করার পাশাপাশি নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। দুর্দশাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়াতে রফতানি আয় ধরে রাখা, নতুন উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ খাতে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘদিনের জমে থাকা ঝুঁকি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version