অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের শেয়ার বাজার দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যায় ভুগছে— বাজার কারসাজি, তথ্য গোপন, সেটেলমেন্টে দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর আস্থাহীনতা। একই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি প্রযুক্তির অগ্রগতিতে দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে। এর মধ্যেই ব্লকচেইন প্রযুক্তি এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা শেয়ার বাজারকে স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং দ্রুতগতির লেনদেনে রূপান্তরের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ ইতোমধ্যেই ব্লকচেইন-ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা চালু করেছে এবং বাস্তব সুফল পাচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠছে— বাংলাদেশ কি এই প্রযুক্তি গ্রহণে প্রস্তুত?
ব্লকচেইন মূলত একটি বিকেন্দ্রীভূত ডিজিটাল লেজার, যেখানে প্রতিটি লেনদেন বা তথ্য ব্লকে সংরক্ষিত হয় এবং ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে পূর্ববর্তী ব্লকের সঙ্গে যুক্ত থাকে। একবার রেকর্ড হলে তা পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব, প্রতিটি রেকর্ড স্থায়ী, যাচাইযোগ্য এবং সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। এতে কারসাজি ও তথ্য বিকৃতির সম্ভাবনা কমে আসে। শেয়ার বাজারে এর প্রয়োগ হলে প্রতিটি শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের ইতিহাস স্বচ্ছভাবে সংরক্ষিত থাকবে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ার ASX ২০২৩ সালে CHESS সেটেলমেন্ট সিস্টেমে ব্লকচেইন যুক্ত করে সেটেলমেন্ট সময় ২–৩ দিন থেকে কমিয়ে তাৎক্ষণিক পর্যায়ে এনেছে, ফলে বাজারের লিকুইডিটি বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডের SIX Digital Exchange সম্পূর্ণ ব্লকচেইন-ভিত্তিক লেনদেন শুরু করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করেছে। ভারতে কিছু স্টক এক্সচেঞ্জে ব্লকচেইন-ভিত্তিক ট্রেড রিপোর্টিং পাইলট চালু করে কারসাজি সনাক্তে সাফল্য পেয়েছে। ফিলিপাইন ব্লকচেইন ব্যবহার করে শেয়ার ইস্যু ও রেকর্ড রাখার স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে। ভিয়েতনাম ডিজিটাল বন্ড লেনদেনে ব্লকচেইন প্রয়োগ করে সেটেলমেন্ট সময় ও প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রযুক্তিটি শুধু ধনী দেশেই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশেও সফলভাবে কার্যকর করা সম্ভব।
বাংলাদেশে ব্লকচেইন প্রযুক্তি সংযোজন হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে লেনদেনের স্বচ্ছতায়। প্রতিটি শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় স্থায়ীভাবে রেকর্ড হয়ে যাবে, যা জনসম্মুখে যাচাইযোগ্য হবে এবং পরিবর্তনযোগ্য নয়। এর ফলে বিনিয়োগ সন্ত্রাসীদের কারসাজির সুযোগ নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়া বর্তমানের T+2 বা T+3 থেকে কমে কয়েক সেকেন্ডে সম্পন্ন হবে, যা বাজারের লিকুইডিটি বাড়াবে এবং বিনিয়োগকারীদের পুঁজি দ্রুত ঘুরে আসতে সহায়তা করবে। বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই তাদের লেনদেনের ইতিহাস সরাসরি যাচাই করতে পারবে, ফলে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি নির্ভরশীলতা কমবে এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা রিয়েল-টাইমে বাজার পর্যবেক্ষণ করতে পারবে, যা অনিয়ম দ্রুত সনাক্ত ও প্রতিরোধে সহায়তা করবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাজারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, কারণ তারা উন্নত নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা পাবে।
তবে ব্লকচেইন প্রযুক্তি বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবে। প্রথমত, এটি চালু করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার, উন্নত সাইবার সিকিউরিটি এবং প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন হবে, যা এককালীন বড় বিনিয়োগ দাবি করবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান সিকিউরিটিজ আইন, ডিপোজিটরি অ্যাক্ট ও এক্সচেঞ্জ প্রবিধানে সংশোধন আনতে হবে, যা প্রশাসনিকভাবে সময়সাপেক্ষ। তৃতীয়ত, বিনিয়োগ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই প্রযুক্তির বিরোধিতা করতে পারে, কারণ এটি কার্যকর হলে তাদের গোপন ম্যানিপুলেশন আর সম্ভব হবে না। বাজারের সব অংশগ্রহণকারী— ব্রোকার, ডিপোজিটরি, নিয়ন্ত্রক এবং বিনিয়োগকারী— এর প্রশিক্ষণ ও অভিযোজনও জরুরি হবে, নইলে নতুন প্রযুক্তি চালুর পরও পুরনো অভ্যাস বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্লকচেইন প্রতিটি লেনদেনকে স্থায়ী ও যাচাইযোগ্যভাবে রেকর্ড করবে, আর AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ডেটাকে রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ করবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নির্দিষ্ট শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেন হলে AI সাথে সাথে সেটি চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা পাঠাবে। এর ফলে দীর্ঘ তদন্ত বা ম্যানুয়াল বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে না— কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কারসাজির সম্ভাব্য কার্যক্রম শনাক্ত করা সম্ভব হবে। AI এর ডেটা মডেল বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন প্যাটার্ন শিখে নেবে, ফলে অস্বাভাবিক লেনদেন সহজেই ধরা পড়বে। এই সমন্বয় শুধু কারসাজি প্রতিরোধেই নয়, বরং বাজার বিশ্লেষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের উচিত প্রথম ধাপে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা, যেখানে সীমিত সংখ্যক শেয়ারের লেনদেন ব্লকচেইন প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হবে এবং এর সাথে AI ইন্টিগ্রেশন যুক্ত করে কারসাজি সনাক্তকরণের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি, আইনগত সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে যাতে প্রযুক্তি বাস্তবায়নে কোনো আইনি জটিলতা না থাকে। বিনিয়োগকারী, ব্রোকার এবং নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে তারা প্রযুক্তির সুবিধা বুঝে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে। বিদেশি বাজারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ধাপে ধাপে পুরো বাজারে ব্লকচেইন সংযোজন করলে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা— সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সবশেষে বলা যায়, ব্লকচেইন প্রযুক্তি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে আস্থা পুনর্গঠনের জন্য একটি মৌলিক সংস্কার। উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের সফল উদাহরণ প্রমাণ করেছে, এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে বাজার হবে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের— আমরা কি এই প্রযুক্তি গ্রহণ করে ভবিষ্যতের দিকে এগোব, নাকি অতীতের অন্ধকারেই আটকে থাকব? ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/১২ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

