অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নজিরবিহীনভাবে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশের ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র। এই ভয়াবহ ঋণখেলাপির প্রধান কারণগুলো হলো পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। স্বল্প মেয়াদে এবং সহজ শর্তে বিতরণ করা অনেক ঋণ এখন আর ফেরত আসছে না। বিশেষত, যারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন অথবা কোম্পানি বন্ধ করে আত্মগোপনে গেছেন, তাদের নেওয়া ঋণগুলো এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া প্রায় ভেঙে পড়েছে।
বর্তমানে বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি ঋণগুলোকে খেলাপি হিসেবে দেখানো না হলেও, এদের অনেকেরই পরিশোধের সময় এখনো আসেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতে এই ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরে যদি সেগুলো অনাদায়ী থাকে, তাহলে খেলাপি ঋণের হার আরও অনেক বেড়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের বেশি হলেই তাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতে এই হার প্রায় ৪.৫ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৭-৮ শতাংশ। সেই তুলনায় বাংলাদেশের ২০ শতাংশের খেলাপি ঋণের হার আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ব্যাংকিং খাতকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও প্রতিফলন। অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের মতে, এটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ, ঋণ অনুমোদন কমিটি এবং তদারকি কাঠামোতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের নিয়োগের কারণেই আজ ব্যাংকিং খাত এই গভীর সংকটে পড়েছে।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের শ্রেণিকরণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতি রেখে পরিবর্তন করেছে। এখন থেকে কোনো ঋণের কিস্তি তিন মাস অনাদায়ী থাকলে তাকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পূর্বে এই সময়সীমা ছিল ছয় থেকে নয় মাস। ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেও, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে এই নতুন সংজ্ঞা কার্যকর রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা চাওয়া, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ নিলামে তোলা এবং ব্যবসায়িক কারণে যারা খেলাপি হয়েছেন তাদের জন্য বিশেষ ছাড়ে ঋণ নবায়নের সুযোগ দেওয়া। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বীকার করেছে যে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা একটি সময়সাপেক্ষ এবং জটিল প্রক্রিয়া।
বিশ্লেষকদের অভিমত, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। ঋণ অনুমোদনের পূর্বে একটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। ঋণগ্রহীতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ করে পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ব্যাংকিং আদালতের সংস্কার এবং এর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সাথে, ক্রেডিট গ্যারান্টি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্বচ্ছতামূলক প্রযুক্তি-নির্ভর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদি এখনই কার্যকর এবং সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই সংকট কেবল ব্যাংকিং খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১৯ মে,২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 10 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version