অর্থকাগজ প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও দেশের ভোক্তারা আপাতত এর সরাসরি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না। কারণ, বৈশ্বিক বাজারে কয়েক মাসের অস্থিরতার ফলে সৃষ্ট বিপুল ভর্তুকি ব্যয় সামাল দেওয়াকেই সরকার এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে চাপ কমেছে। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা তীব্র হওয়ার আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৭২.৪৮ ডলার। সংঘাতের প্রভাবে ১৮ মে তা বেড়ে ১১২ ডলারে পৌঁছে যায়, যা যুদ্ধপূর্ব অবস্থানের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি।

তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারেও সংশোধন শুরু হয়েছে। গত ১৫ জুন একদিনেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪.৭৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৩.১৯ ডলারে নেমে আসে। মে মাসে সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় দাম প্রায় ২৬ শতাংশ কমলেও তা এখনও সংঘাত শুরুর আগের দামের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি রয়েছে।

বিশ্ববাজারে দরপতনের এই প্রবণতা সত্ত্বেও দেশে জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য কমানোর বিষয়ে সরকারের তেমন কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বর্তমান পর্যায়টি এখনও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিজেল বিক্রিতে সরকারকে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কিছুটা কমলেও তা সরকারের ব্যয়ভার কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে বাজার পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর বড় অংশ ব্যয় হবে ডিজেলের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে পেট্রোল, অকটেন ও বেশ কিছু পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের বর্তমান বিক্রয়মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকায় সেগুলোতে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রয়োজন হচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অপরিশোধিত তেলের বাজারেও বড় ধরনের মূল্য সংশোধন দেখা যাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুডের দাম ১৮ মে যেখানে ব্যারেলপ্রতি ১১০.০৪ ডলার ছিল, বর্তমানে তা কমে ৭৯.৩১ ডলারে নেমেছে, যা প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাসের সমান।

একইভাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ব্যবহৃত আরব লাইট ক্রুডও উল্লেখযোগ্যভাবে সস্তা হয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এর দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১১৯.০৯ ডলার, যা বর্তমানে কমে ৮৭.৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে মূল্যহ্রাস হয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ।

উল্লেখ্য, গত এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকার দেশীয় বাজারেও জ্বালানির দাম বাড়ায়। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১.৮৭ ডলারে পৌঁছেছিল।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকায় উন্নীত করা হয়। পরে মে মাসের শেষ দিকে দ্বিতীয় দফায় সমন্বয়ের মাধ্যমে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও তার সুফল সবসময় ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায় না। বিশেষ করে পরিবহন খাতে ভাড়া ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় সাধারণত দ্রুত কমানো হয় না। ফলে জ্বালানির মূল্যহ্রাসের ইতিবাচক প্রভাব বাজারে সীমিত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভবিষ্যতে তেলের দাম কমার সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হলে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যহ্রাস হলেও তার পূর্ণ সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version