বিশেষ প্রতিনিধি>
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে একদিনেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের মহেশখালীতে চীনের সহায়তায় নতুন একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল স্থাপনের অনুমোদন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আগামী ১৩ বছর এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে জ্বালানি তেল কেনার সময়সীমা ৪২ দিনের পরিবর্তে আবারও ১০ দিনে নামিয়ে আনা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই তিন সিদ্ধান্তে সরকারের জ্বালানি কৌশলের একটি নতুন দিক স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে গ্যাস গ্রহণ ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি কমিয়ে তেল কেনার কৌশল—সব মিলিয়ে জ্বালানি সরবরাহ আরও স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে সরকার।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মহেশখালীতে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল
সরকার মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় একটি নতুন ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ (এফএসআরইউ) টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে চীনের চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড।
সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুসারে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে প্রস্তাবটি প্রক্রিয়াকরণ করা হবে।
বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু রয়েছে। নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে দেশে এলএনজি গ্রহণ ও পুনঃগ্যাসীকরণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এর ফলে আমদানি করা এলএনজি দ্রুত জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
১৩ বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি
একই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গুনভর ইউএসএ এলএলসি থেকে ২০২৬ থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর মেয়াদে প্রতি বছর ছয়টি এলএনজি কার্গো আমদানির প্রস্তাবেও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলা এ চুক্তি বাস্তবায়ন করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ কাতার, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাতটি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির আওতায় গ্যাস আমদানি করছে। নতুন চুক্তি কার্যকর হলে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হবে।
তেল কেনার দরপত্রে সময় কমল
জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমাও আবার কমিয়ে আনা হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ের আমদানির জন্য ৪২ দিনের পরিবর্তে ১০ দিনের মধ্যে দরপত্র জমা নেওয়া হবে।
সরকারের যুক্তি, দীর্ঘ সময় হাতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার আশঙ্কায় সরবরাহকারীরা দরপত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকি মূল্য (রিস্ক প্রিমিয়াম) যোগ করেন। এতে সরকারের ক্রয় ব্যয় বেড়ে যায়। সময়সীমা কমানো হলে প্রতিযোগিতামূলক দামে জ্বালানি তেল কেনার সুযোগ বাড়বে।
কী বার্তা দিচ্ছে এই সিদ্ধান্ত
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তিনটি সিদ্ধান্ত একসঙ্গে নেওয়ার মাধ্যমে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার কৌশল নিয়েছে।
একদিকে চীনের সহযোগিতায় এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তেল আমদানির প্রক্রিয়াও আরও নমনীয় করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও তুলনামূলক কম খরচে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতির ওপর।
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

