রাজীব আহমেদ সাকিব
পপ সঙ্গীতের অবিসংবাদিত সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন কেবল সুর ও নাচের জাদুকরই ছিলেন না, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, সৃষ্টিশীলতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রভাব ছিল রহস্য ও বিস্ময়ে ভরপুর। বিশ্বসঙ্গীতের এই মহাান শিল্পীর কিছু অদ্ভুত ও অজানা অধ্যায়ের পাশাপাশি তাঁর গানগুলোর অবিশ্বাস্য বাণিজ্যিক আয়-ব্যয়, বিনিয়োগ সাম্রাজ্য এবং বিশ্বরেকর্ডসমূহের এক সুদীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. মাইকেল জ্যাকসনের বাবা জোসেফ জ্যাকসন ভূতুরে মাস্ক পরে মাইকেলের বেডরूमের জানালা বেয়ে উঠে চিৎকার করে মাইকেলকে ভয় দেখিয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, তিনি সন্তানদের বেডরুমের জানলা খোলা না রেখে ঘুমানো শেখাচ্ছিলেন। এই ঘটনা মাইকেলকে দীর্ঘদিন ট্রমার মধ্যে রেখেছিল। মাইকেল জ্যাকসনের শৈশব সুখকর ছিল না। মনে করা হয়, মাইকেল ও তাঁর ভাইবোনেরা সবাই তাঁদের বাবা জোসেফ জ্যাকসনের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। মাইকেল জ্যাকসন প্রথম অপরাহ উইনফ্রের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি খোলাখুলি বলেন। জোসেফ জ্যাকসন রিহার্সালের নাম করে সন্তানদের নির্যাতন করতেন। মাইকেলকে তিনি 'বিগ নোজ' বলে ডাকতেন এবং একবার পা ওপর মাথা নিচে রেখে শূন্যে ঝুলিয়েও পিটিয়েছিলেন।
২. প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সাঙ্গীতিক ভাষা লিখতে ও পড়তে না জানা সত্ত্বেও মাইকেল তাঁর গান রচনা করতেন নিজে নিজেই। গানের প্রত্যেকটা কর্ড, হারমনি, মেলডি, ব্যাস এমনকি রিদম—সবকিছু তিনি নিজের গলায় তুলতেন। মাইকেল ছিলেন সত্যিকারের 'মিউজিক্যাল জিনিয়াস', কাগজে লেখার আগেই তিনি পুরো গান গলায় তুলে নিতেন।
৩. মাইকেল জ্যাকসন এলভিস প্রিসলির মেয়ে লিসা মেরি প্রিসলিকে বিয়ে করেছিলেন। রক অ্যান্ড রোল কিংবদন্তি এলভিস প্রিসলির মেয়ে লিসা মেরি প্রিসলি নিজেও ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী ও গীতিকার। লিসা একসময় ছিলেন মাইকেল জ্যাকসনের স্ত্রী। মাইকেল জ্যাকসনের 'ইউ আর নট এলোন' গানের ভিডিওতে লিসাকে দেখা গিয়েছিল। তারা পরস্পরের প্রেমে পড়েন। ইমোশনাল সাপোর্টের জন্য মাইকেল লিসার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। লিসা তাঁকে ড্রাগ এবিউজ থেকে মুক্তি পেতে রিহ্যাবে ভর্তি করতে রাজি করান। প্রিসলির মতে, তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের পরেও তারা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিল।
৪. মাইকেল জ্যাকসনের অনেক অদ্ভুত স্বভাবের একটি ছিল প্র্যাঙ্ক কল করা। একবার তিনি অভদ্র এক হোটেল ম্যানেজারের কণ্ঠ নকল করে অভিনেতা রাসেল ক্রোকে ফোন করেছিলেন। এরপর থেকে রাসেল ক্রো যে হোটেলেই উঠুক না কেন, মাইকেল কমিক ভয়েসে তাকে ফোন করতেন। মাইকেল জ্যাকসনের এই প্র্যাঙ্ক কল করার কথা রাসেল ক্রো জানান গ্রাহাম নর্টনের ইন্টারভিউতে। অথচ বাস্তবে তাদের কখনই দেখা হয়নি। যখন রাসেল ক্রো মাইকেলের বন্ধুদের এই প্র্যাঙ্ক কলের কথা জানান, তারা অবাক তো হনই না, বরং বলেন—মাইকেল সবসময়ই এরকম একে-ওকে প্র্যাঙ্ক কল করে থাকেন।
৫. মাইকেল জ্যাকসনের সিগনেচার স্টাইল 'অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি লিন' করা হয়েছে বিশেষ ধরনের জুতার সাহায্যে। এই জুতা মাইকেল নিজেই ডিজাইন করেছেন এবং কপিরাইট নিয়ে নিয়েছেন। ১৯৮৭ সালে মিউজিক ভিডিও 'স্মুথ ক্রিমিনাল'-এর জন্য জ্যাকসন এক ধরনের ডান্স রুটিন ঠিক করেন, যাতে তাকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে সামনের দিকে ঝুঁকতে হয়, আপাতভাবে যা দেখে মনে হয় অভিকর্ষ বলকে তার শরীর অস্বীকার করছে।
৬. আশির দশকে তারকাশিল্পী, রক ব্যান্ড কুইনের ভোকাল ফ্রেডি মার্কারির সঙ্গে যৌথভাবে মাইকেল জ্যাকসনের একটা অ্যালবাম হওয়ার কথা ছিল। তারা তিনটা গানও রেকর্ড করেন। তবে মার্কারি চুক্তি বাদ দিয়ে সেই কাজ ভণ্ডুল করে দেন, কারণ জ্যাকসন তার পোষা লামাকে স্টুডিওতে নিয়ে আসতেন। ১৯৮৩ সালে গানগুলো রেকর্ড করা হয় ক্যালিফোর্নিয়ায় মাইকেলের বাসার স্টুডিওতে। তখন মাইকেল ও মার্কারি দুজনেই তাদের খ্যাতির চূড়ায়। অবশ্য মতপার্থক্যের কারণেই অ্যালবামটা তারা কখনো শেষ করতে পারেননি। মার্কারি রেকর্ডিংয়ের সময় স্টুডিওতে মাইকেলের লামা নিয়ে আসাটা পছন্দ করতেন না, আর মাইকেলের লিভিং রুমে মার্কারির প্রচুর পরিমাণে কোকেন নেওয়াটাও মাইকেল ভালো চোখে দেখেননি। দুই তারকার মৃত্যুর পর, ২০১১ সালে গান তিনটি রিলিজ দেওয়া হয়।
৭. মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন কমিক্সের মহাভক্ত। এমনই ছিল তার কমিক্স প্রীতি যে তিনি স্পাইডারম্যান চরিত্রে অভিনয়ের চেষ্টা করেছিলেন। একবার তো মার্ভেলকে কিনেই নিতে চেয়েছিলেন! মার্ভেলের চেয়ারম্যান এবং মার্ভেলের অনেকগুলো সুপারহিরোর স্রষ্টা স্ট্যান লির মতে, মাইকেল জ্যাকসন কমিক্স কোম্পানিটি কিনতে চেয়েছিলেন কারণ তিনি মনে করেছিলেন কোম্পানিটি কিনে নিলেই কেবল তিনি স্পাইডারম্যান চরিত্রে অভিনয় করতে পারবেন। যদিও লি মনে করেন মাইকেলকে স্পাইডারম্যান চরিত্রে মানাতো, তবে চরিত্রটির জন্য টবি ম্যাগুইরেকেই উপযুক্ত মনে করেছিলেন তিনি।
৮. মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পর তার ভল্টে শত শত আনরিলিজড গান পাওয়া গেছে। মাইকেলের মৃত্যুর পর, তার বোন লা টয়া জ্যাকসন দুটি হার্ড ডিস্ক পেয়েছেন যেখানে এক হাজারেরও বেশি গান ছিল। এই গানগুলো কখনও রিলিজ করা হয়নি, এমনকি কোনো এজেন্সির সাথে রেজিস্ট্রেশনও করা ছিল না। বলা হয়ে থাকে, মাইকেল তার জীবদ্দশায় প্রায় ৫০ হাজার গান রেকর্ড করেছেন।
৯. মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে সেই প্রচলিত কাহিনীটা হয়তো জানেন, যেখানে বলা হয় তিনি বয়স বৃদ্ধি ঠেকাতে অক্সিজেন চেম্বারের মধ্যে বাস করছেন। এইটা যে একটা বানোয়াট গল্প সেটা অনেকেই জানেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই গল্প মাইকেল জ্যাকসন নিজেই বানিয়েছিলেন এবং নিজেই প্রেসে সত্যি বলে ফাঁস করেছিলেন।
১০. ২৫ জুন ২০০৯ সালে মারা যান মাইকেল জ্যাকসন। তার মৃত্যুর পর গুগলে জ্যাকসনকে নিয়ে এত সার্চ হয়েছিল যে গুগল ভেবেছিল এটা তাদের সার্চ ইঞ্জিনের সার্ভারে আক্রমণ! ফলে গুগল ২৫ মিনিটের মতো সার্চ অপশন বন্ধ রেখেছিল। পরে তারা ভুল বুঝতে পেরে সেবা স্বাভাবিক রাখে। ইয়াহু মাইকেলের মৃত্যুর খবর বিষয়ে একটা লিড স্টোরি করে সেদিন, যা রেকর্ড পরিমাণ ১৬.৪ মিলিয়ন ইউনিক ভিজিটর পায়। জ্যাকসনের মৃত্যুর দিনে উইকিপিডিয়া, টুইটার ও এওএল সবগুলো একই সঙ্গে ক্র্যাশ করেছিল।
মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গীত জীবন কেবল জনপ্রিয়তাই অর্জন করেনি, এটি বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ও লাভজনক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। তাঁর গান, অ্যালবাম প্রকাশনা, লাইভ কনসার্ট ট্যুর, এবং সুচিন্তিত কপিরাইট বিনিয়োগ তাঁকে এক অভাবনীয় আর্থিক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'থ্রিলার' অ্যালবামটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিক্রীত অ্যালবামের স্বীকৃতি পায়, যার গ্লোবাল সেলস আনুমানিক ৭ কোটি থেকে ১০ কোটি কপিরও বেশি। শুধু অ্যালবাম বিক্রি নয়, মাইকেল জ্যাকসনের 'ব্যাড ওয়ার্ল্ড ট্যুর' (১৯৮৭-১৯৮৯) এবং 'হিস্ট্রি ওয়ার্ল্ড ট্যুর' (১৯৯৬-১৯৯৭) বিশ্বজুড়ে শত শত কোটি ডলারের বক্স অফিস আয় নিশ্চিত করেছিল। কনসার্টগুলোর উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়া সত্ত্বেও টিকিট বিক্রি এবং স্পন্সরশিপ থেকে নিট মুনাফা ছিল রেকর্ড পরিমাণ।
মাইকেল জ্যাকসনের বাণিজ্যিক দক্ষতার সবচেয়ে বড় নিদর্শন ছিল তাঁর বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মেধাস্বত্ব ও ক্যাটালগ অধিগ্রহণ। ১৯৮৫ সালে তিনি মাত্র ৪.৭ কোটি ডলারে দ্য বিটলস ব্যান্ডের বিখ্যাত ২৬০টিরও বেশি গানের কপিরাইট ও পাবলিশিং রাইটস কিনে নেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে তিনি সনি কর্পোরেশনের সাথে যৌথভাবে 'সনি/এটিভি মিউজিক পাবলিশিং' প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ২০১৬ সালে সনি ৭৫ কোটি ডলারে কিনে নেয়। এই একটিমাত্র কৌশলগত বিনিয়োগ জ্যাকসনের এস্টেটকে বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যে রূপান্তর করে। এছাড়া পেপসি কোম্পানির সঙ্গে ঐতিহাসিক বিজ্ঞাপন চুক্তি, তাঁর নিজস্ব মার্চেন্ডাইজিং এবং সুগন্ধি ব্র্যান্ডের ব্যবসা তাঁর বার্ষিক আয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
জীবিতাবস্থায় ও মরণোত্তর আয়ের দিক থেকেও মাইকেল জ্যাকসন সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। ফোর্বস সাময়িকীর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর এস্টেট বিভিন্ন রয়্যালটি, ক্যাটালগ বিক্রি এবং নতুন প্রজেক্ট থেকে বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে, যার ফলে তিনি বিশ্বের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয়কারী মৃত সেলিব্রিটির তালিকায় অবিসংবাদিতভাবে শীর্ষে অবস্থান করছেন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুসারে তিনি "সর্বকালের সবচেয়ে সফল এন্টারটেইনার" হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ১৩টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, যার মধ্যে ১৯৮৪ সালের একক রাতে রেকর্ড ৮টি গ্র্যামি জয়ের অনন্য কীর্তি রয়েছে। বিশ্বজুড়ে তাঁর মোট রেকর্ড বিক্রি প্রায় ৫০ কোটি কপি ছাড়িয়ে গেছে, যা আধুনিক মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এক অনন্য এবং পতনহীন বাণিজ্যিক মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
সর্বকালের সেরা বিক্রীত অ্যালবাম: 'থ্রিলার' (Thriller, 1982) অ্যালবাম — ৭০-১০০ মিলিয়ন কপি বিক্রি, RIAA কর্তৃক ৩৩x প্ল্যাটিনাম সার্টিফাইড।
মেধাস্বত্ব ও মিউজিক ক্যাটালগ: দ্য বিটলস ক্যাটালগ ও সনি/এটিভি চুক্তি — প্রাথমিক বিনিয়োগ ৪.৭ কোটি ডলার, পরবর্তীতে সনি কর্তৃক ৭৫০ মিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণ।
কনসার্ট ট্যুর ও বক্স অফিস আয়: ব্যাড ও হিস্ট্রি ওয়ার্ল্ড ট্যুর — মিলিয়ন মিলিয়ন দর্শক এবং বিশ্ব রেকর্ড গড়া কনসার্ট গ্রস রেভিনিউ।
মরণোত্তর আর্থিক আয় (ফোর্বস): ২০০৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এস্টেটের আয় — বিলিয়ন ডলারের বেশি আয়, শীর্ষ আয়কারী মৃত তারকা হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি।
বিশ্বরেকর্ড ও গ্র্যামি অর্জন: ১৩টি গ্র্যামি ও গিনেস বুক স্বীকৃতি — এক রাতে ৮টি গ্র্যামি জয়ের রেকর্ড এবং ৫০ কোটি+ গ্লোবাল রেকর্ড সেলস।
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

