রুনা হোসেন> 

দিনভর কাজের ব্যস্ততা শেষে বিছানায় গিয়েও অনেকের সহজে ঘুম আসে না। কেউ তখন মোবাইল ফোনে স্ক্রল করেন, কেউ টেলিভিশন দেখেন, আবার কেউ কানে হেডফোন দিয়ে শুনতে শুরু করেন প্রিয় কোনো গান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘুমের আগে শান্ত সংগীত শোনাকে অনেকেই ‘মিউজিক থেরাপি’ হিসেবে গ্রহণ করছেন। কিন্তু সত্যিই কি সংগীত ভালো ঘুমে সাহায্য করে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক ধরনের সংগীত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সহায়তা করতে পারে। এতে শরীর ধীরে ধীরে শিথিল হয় এবং মস্তিষ্ক ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। ফলে অনেকের ক্ষেত্রে দ্রুত ঘুম আসে এবং ঘুমের মানও কিছুটা উন্নত হতে পারে।

কীভাবে কাজ করে মিউজিক থেরাপি?

ঘুমের আগে ধীর লয়ের (প্রতি মিনিটে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ বিট) শান্ত সংগীত শুনলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দও ধীরে আসে। হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কিছুটা কমে, মানসিক উত্তেজনা হ্রাস পায় এবং শরীরে প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি হয়। এসব পরিবর্তন মস্তিষ্ককে ঘুমের উপযোগী অবস্থায় যেতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শান্ত সংগীত শোনার অভ্যাস অনেকের ঘুমাতে সময় কমাতে এবং গভীর ঘুমের অভিজ্ঞতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।

ঘুমের আগে কী ধরনের সংগীত উপকারী?

সব ধরনের গান ঘুমের জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। এমন সুর বেছে নেওয়া ভালো, যা মনকে শান্ত করে এবং অতিরিক্ত আবেগ বা উত্তেজনা তৈরি করে না।

ঘুমের আগে শোনা যেতে পারে—

  • মৃদু পিয়ানো বা গিটারের যন্ত্রসংগীত
  • বৃষ্টির শব্দ, সমুদ্রের ঢেউ, ঝরনার কলকল বা পাখির ডাকের মতো প্রকৃতির শব্দ
  • মেডিটেশন বা রিল্যাক্সেশনের জন্য তৈরি সাউন্ডস্কেপ
  • ধীর লয়ের শাস্ত্রীয় সংগীত
  • কম ভলিউমে রবীন্দ্রসংগীত বা অন্য কোনো শান্ত সুরের গান, যদি তা আপনার মনে প্রশান্তি আনে

কোন ধরনের গান এড়িয়ে চলবেন?

ঘুমানোর ঠিক আগে উচ্চ শব্দের গান, দ্রুত তালের সংগীত বা অত্যন্ত আবেগঘন গান অনেকের মস্তিষ্ককে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে। এতে শরীরের বিশ্রামের পরিবর্তে উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।

তাই শোবার আগে এমন সংগীত এড়িয়ে চলাই ভালো, যা আপনাকে উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন বা আবেগপ্রবণ করে তোলে।

কতক্ষণ শুনবেন?

বিশেষজ্ঞরা সাধারণত ঘুমানোর ২০ থেকে ৩০ মিনিট আগে শান্ত সংগীত শোনার পরামর্শ দেন। বর্তমানে বেশিরভাগ মিউজিক অ্যাপেই ‘স্লিপ টাইমার’ সুবিধা রয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে গান বন্ধ করে দেয়। এটি ব্যবহার করলে সারারাত গান বাজতে থাকে না এবং ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটে না।

হেডফোন নাকি স্পিকার?

দীর্ঘ সময় হেডফোন বা ইয়ারফোন পরে ঘুমিয়ে পড়া আরামদায়ক বা নিরাপদ নাও হতে পারে। এতে কানে অস্বস্তি, চাপ বা দীর্ঘমেয়াদে শ্রবণ সমস্যার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সম্ভব হলে খুব কম ভলিউমে স্পিকারে সংগীত শোনা ভালো। যদি হেডফোন ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে এমন ডিভাইস ব্যবহার করুন যা আরামদায়ক এবং কানে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে না।

শুধু মিউজিক থেরাপিই কি যথেষ্ট?

মিউজিক থেরাপি ভালো ঘুমের একটি কার্যকর সহায়ক হতে পারে, তবে এটি অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। ভালো ঘুমের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ জন্য কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে—

  • প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠা
  • ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন, ট্যাব বা টেলিভিশনের স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করা
  • সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা
  • রাতে অতিভোজন না করা
  • শোবার ঘরকে শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখা

শেষ কথা

শান্ত সংগীত কোনো জাদুকরী ওষুধ নয়, তবে এটি অনেক মানুষের জন্য ঘুমের প্রস্তুতি সহজ করে দিতে পারে। যদি নিয়মিত ঘুমের সমস্যা থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাসের পাশাপাশি মিউজিক থেরাপি একটি সহজ, নিরাপদ ও ওষুধবিহীন সহায়ক পদ্ধতি হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন অনিদ্রা, নাক ডাকা, শ্বাসকষ্ট বা ঘুমের অন্যান্য জটিল সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version