অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অবশেষে চূড়ান্ত রূপ পেতে যাচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি এই বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে একে ভারত–ইইউ সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় ইউরোপ থেকে আমদানি করা গাড়ি ও মদের ওপর ভারতের উচ্চ শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হতে পারে। এর বিনিময়ে ভারতের তৈরি পোশাক, গয়না, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য ইউরোপীয় বাজার আরও উন্মুক্ত হবে। এতে করে ইউরোপের ২৭ দেশের বিশাল ভোক্তা বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে ভারত নতুন সুযোগ পাবে।
আগামী ২৫ থেকে ২৮ জানুয়ারি ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের ভারত সফরকে ঘিরেই এই ঘোষণার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই বৈঠক থেকেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যুগান্তকারী ঘোষণা আসতে পারে, যা বাস্তবায়িত হলে ভারত ও ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
শুধু বাণিজ্য নয়, এই চুক্তির পাশাপাশি ভারত ও ইইউ একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতেও স্বাক্ষর করতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পর ভারতই হবে তৃতীয় রাষ্ট্র, যাদের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ধরনের কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। এছাড়া উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবী, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের চলাচল সহজ করতে একটি ‘মবিলিটি এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা মানবসম্পদ বিনিময়ে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
বর্তমানে ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিসর ইতোমধ্যেই বেশ বড়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দুই পক্ষের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে চুক্তি ঘোষণা হলেও এটি কার্যকর করতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে, যা সম্পন্ন হতে আরও অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত করার ঘোষণা দেওয়ার পর ভারত বিকল্প বাজার ও নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারের সন্ধানে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতায় ইউরোপের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে চুক্তির পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন স্বীকার করেছেন যে, চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত হলেও কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনো সমঝোতা বাকি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারতের গাড়ি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক। এই শুল্ক কমানো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো দরকষাকষি চলছে। শুল্ক হ্রাস পেলে ফক্সওয়াগন বা রেনল্টের মতো ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিতে পারবে।
এ ছাড়া কিছু অশুল্ক বাধা বা ‘নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার’ নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন কার্বন ট্যাক্স এবং ভারতের জন্য প্রযোজ্য সাধারণ শুল্ক সুবিধা (জিএসপি) প্রত্যাহার দেশটির রপ্তানিকে চাপে ফেলেছে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, জিএসপি সুবিধা বাতিল হওয়ায় প্রায় ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে নয়াদিল্লি।
দিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতের তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
সার্বিকভাবে, এই মুক্ত বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, বরং ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন মাত্রা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ●
অকা/প্র/ই/দুপুর/২৪ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 days আগে

