অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
ব্যাংক খাতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ। চলতি বছরের জুন শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের জুনে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা বা ৪৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক এক হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
ব্যাংকাররা জানান, করোনার সময় ব্যবসা-বাণিজ্যের নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় অনেক ব্যবসায়ীর ঋণের কিস্তি দেয়ার সক্ষমতা ছিল না। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকঋণ পরিশোধে শিথিলতা আনে। পরবর্তী সময়ে যখন পরিস্থিতি ভালো হয়েছে, তখন আবার ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ শুরু হলো। এই দুই কারণে ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ কম করছে। তাই আদায় কম হয়েছে। ঋণ আদায় না হওয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও ঋণ আদায় কম হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। এরপর ২০১৯ সালের জুন শেষে ৯ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা বেড়ে স্থিতি দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জুন শেষে আরও ১৫ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা বেড়ে স্থিতি ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা হয়।
২০২১ সালের জুন শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। আর ২০২২ সালের জুন শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ ১৯ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা বেড়ে স্থিতি দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। সর্বশেষ চলতি বছরের জুন শেষে ২৬ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা বেড়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ বছরে সবচেয়ে বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বাড়ে ব্যাংক খাতে।
ব্যাংক খাতে গত পাঁচ বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জুন শেষে শিল্প খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের স্থিতি ছিল ৫৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের একই সময়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে এ খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বেড়েছে ৩৩ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা বা ৬১ দশমিক ১৩ শতাংশ। বর্তমানে শিল্প খাতে ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে গত পাঁচ বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২৯ শতাংশ। ২০১৮ সালের জুন ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের স্থিতি ছিল ৫৬ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের একই সময়ে স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এ খাতে জুন শেষে ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা।
এছাড়া কৃষি খাতে পাঁচ বছরের ব্যবধানে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ২৭৩ কোটি, নির্মাণ খাতে ৩ হাজার ৬৩৪ কোটি এবং ভোক্তা খাতে ৯২৯ কোটি টাকা বেড়েছে। তবে এ সময় যোগাযোগ খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ কমেছে ৩৫৯ কোটি টাকা।
প্রসঙ্গত, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৪৬ হাজার ৭৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের জুন শেষে স্থিতি ছিল ৮ লাখ ৪৭ হাজার ১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৫৮ কোটি টাকা বা ৭০ দশমিক ৭২ শতাংশ।
অন্যদিকে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ব্যাংকগুলোর আদায়কৃত ঋণের পরিমাণ
ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। গত বছরের একই প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো ১ লাখ ৯১ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছিল। এ হিসাবে আদায় বেড়েছে মাত্র ১৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে ডলার সংকট, রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি, অস্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হার বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করছে অর্থনীতিতে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি পরিস্থিতি মন্থরভাব। দেশের মানুষ মূল্যস্ফীতি নাকাল অবস্থা। মানুষের কাছে টাকা কমে যাচ্ছে। রপ্তানিতে সমস্যা হচ্ছে। এসএমই খাতেও সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে ঋণ পরিশোধ কমে গেছে। আবার ব্যাংকগুলোও চাহিদা অনুযায়ী আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছে না। যার ফলে ব্যবসায়ীরা ঠিকভাবে ব্যবসা করতে পারছেন না। এর কারণেও ঋণ আদায় কম হচ্ছে।
অকা/ব্যাংখা/ সকাল, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

