অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের শিল্পখাতে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সমুদ্রপথে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের দামের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন মিলিয়ে দেশের উৎপাদন খাত এখন তীব্র ‘কস্ট-পুশ’ সংকটে পড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তা ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে।

সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের প্রধান রফতানি আয়ের উৎস। আগে থেকেই চূড়ান্ত হওয়া রফতানি আদেশে উৎপাদকদের এখন বাড়তি কাঁচামাল ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এই অতিরিক্ত ব্যয় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে মুনাফার মার্জিন দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

শিল্পখাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কায় অনেক আমদানিকারক আগাম বেশি পরিমাণে ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন—যা বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে দাম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিপরীতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ক্রেতা নতুন অর্ডার স্থগিত রাখছেন। এই দ্বিমুখী চাপ সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

বিভিন্ন খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কাঁচামালের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি ঘটেছে। নন-কটন ফেব্রিকের দাম প্রায় ১৯ শতাংশ, পলিয়েস্টার ফিলামেন্ট সুতা ৭৯ শতাংশ এবং কটন সুতা ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। রাসায়নিকের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি আরও চরম—৫০ শতাংশ থেকে শুরু করে কিছু ক্ষেত্রে ১৮৩ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া ইস্পাত কাঁচামাল ১৭ শতাংশ, ক্লিংকার ৩৪ শতাংশ, প্লাস্টিক রজন ৬৭ শতাংশ এবং ওষুধ শিল্পের মূল উপাদান এপিআই প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

শুধু কাঁচামাল নয়, উৎপাদন ব্যয়ের আরেকটি বড় উপাদান পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। যদিও দেশে এখনো জ্বালানির সরকারি মূল্য অপরিবর্তিত, তবুও পরিবহন খাতে খরচ ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে, সাভার থেকে নরসিংদীর মাধবপুর পর্যন্ত ট্রাক ভাড়া ৬,৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৮,৫০০ টাকায় পৌঁছেছে—যা সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে চাপ সৃষ্টি করছে।

রাসায়নিক খাতে মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। কিছু ক্ষেত্রে অল্প সময়ের ব্যবধানে দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। যেমন, সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম কেজিপ্রতি ৫৫-৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ টাকায় পৌঁছেছে। এই উপাদান শিল্প কারখানার বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি)-এ ব্যবহৃত হয়। ফলে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা ইটিপি যথাযথভাবে পরিচালনা করতে না পারলে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে—যা একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্বেগ তৈরি করছে।

প্লাস্টিক শিল্পেও একই চিত্র। প্লাস্টিক রেজিনের দাম প্রতি মেট্রিকটন ৯০০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১,৬০০ ডলারে পৌঁছেছে। যেহেতু এই কাঁচামালের জন্য বাংলাদেশ প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর এবং এটি পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক, তাই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সরাসরি এই খাতে প্রভাব ফেলছে।

সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতেও ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। ক্লিংকারের দাম প্রতি টন ৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ৫৮ ডলারে উঠেছে, আর ইস্পাত কাঁচামাল ৬০০ ডলার থেকে ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে। উচ্চমূল্যের কারণে অনেক আমদানিকারক ঋণপত্র (এলসি) খোলা বিলম্বিত করছেন, যা ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট আরও বাড়াতে পারে।

ওষুধ শিল্পও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। বৈশ্বিক বাজারে এপিআই এবং অন্যান্য কাঁচামালের দাম গড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সংকট এবং সলভেন্টসহ বিভিন্ন মৌলিক উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলছে।

সরবরাহ শৃঙ্খলেও তৈরি হয়েছে গুরুতর অস্থিরতা। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান পূর্বের স্টক দিয়ে উৎপাদন চালালেও, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অদূর ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—আগেই নেওয়া রফতানি আদেশগুলো। এই অর্ডারগুলোতে নির্ধারিত দামে পণ্য সরবরাহ করতে হবে, কিন্তু কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদকদের অতিরিক্ত ব্যয় নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য মুনাফা কমে গিয়ে লোকসানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের শিল্পখাতকে এক জটিল ব্যয়চাপের চক্রে ফেলে দিয়েছে—যেখানে কাঁচামাল, জ্বালানি, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই খরচ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে তা শুধু শিল্প উৎপাদনই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্তর—দুই ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করবে।

অকা/প্র/ই/সকাল/৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 18 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version