শিপন হালদার> 

একটি রাষ্ট্রের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন খবরের শিরোনাম কেবল একটি ঘটনা জানায় না; বরং রাষ্ট্রের চরিত্র, রাজনীতির পরিপক্বতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ তেমনই একটি মুহূর্ত।

কয়েক সপ্তাহ ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছিল। ক্ষমতার করিডোরে চলছিল ফিসফাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাসছিল অসংখ্য নাম, টেলিভিশনের টকশোতে জমে উঠেছিল বিশ্লেষণ, আর রাজনৈতিক মহলে চলছিল নীরব হিসাব-নিকাশ। শেষ পর্যন্ত সেই জল্পনারই আনুষ্ঠানিক পরিণতি ঘটলো। পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

কিন্তু একটি প্রশ্ন এখানেই সামনে আসে—এটি কি কেবল একজন ব্যক্তির বিদায়, নাকি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নতুন পরীক্ষার শুরু?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়—এই কথাটি আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু বাস্তবে সেই বিশ্বাস কতটা দৃঢ়, তা বোঝা যায় এমন সময়েই। কারণ ব্যক্তি বিদায় নেন, প্রতিষ্ঠান থেকে যায়; ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বদলায় না। সংবিধানের শক্তি ঠিক এখানেই।

রাজনীতির উত্তাপ, সংবিধানের শীতলতা

বাংলাদেশের রাজনীতি বহুবার উত্তপ্ত হয়েছে। মতবিরোধ হয়েছে, সংঘাত হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে সংবিধান। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ঘটনাও সেই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতারই অংশ।

আমাদের সংবিধান এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য আগেই পথ নির্ধারণ করে রেখেছে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ কোনো শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই।

এটাই একটি পরিণত রাষ্ট্রব্যবস্থার সৌন্দর্য। কারণ গণতন্ত্রে অনিশ্চয়তা নয়, পূর্বনির্ধারিত নিয়মই শেষ কথা।

বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদের সদস্যরাই তাঁকে নির্বাচন করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্ক এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হলো—রাষ্ট্রপতি শেষ পর্যন্ত পুরো রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।

ইসির সামনে এক নীরব পরীক্ষা

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সামনে আসে—নির্বাচন কমিশন-ইসি।

কমিশনের কাজ কেবল একটি তফসিল ঘোষণা নয়; বরং সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী এমন একটি নির্বাচন সম্পন্ন করা, যাতে পুরো প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা অটুট থাকে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের মতো উত্তেজনাপূর্ণ নয়। এখানে জনসভা নেই, পোস্টার নেই, নির্বাচনী প্রচারণার কোলাহলও নেই। কিন্তু নীরব এই নির্বাচনও রাষ্ট্রের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি নির্ধারণ করে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কে বসবেন।

নির্বাচন কমিশনের সামনে বর্তমান চ্যালেঞ্জ কেবল সময়মতো নির্বাচন আয়োজন করা নয়; বরং এমন একটি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যাতে আইন, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা—তিনটিই সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।

রাষ্ট্রপতি কে—এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন, রাষ্ট্রপতি কেমন?

পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক মহলে কয়েকটি নাম ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে। শোনা যাচ্ছে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আরেক সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এর নাম।

এটি স্বাভাবিক। প্রতিবারই এমন হয়।

কিন্তু নামের তালিকার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাংলাদেশ এই মুহূর্তে কেমন রাষ্ট্রপতি চায়?

আমরা কি কেবল একজন সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার ধারক খুঁজছি? নাকি এমন একজন ব্যক্তিত্বের সন্ধান করছি, যিনি প্রয়োজনে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে সংযমের ভাষা বলবেন, সাংবিধানিক সংকটে ভারসাম্যের প্রতীক হবেন এবং জাতীয় জীবনে নৈতিক নেতৃত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করবেন?

রাষ্ট্রপতির হাতে নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হতে পারে, কিন্তু নৈতিক কর্তৃত্ব কখনোই ছোট নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কোনো কোনো রাষ্ট্রপতির একটি সংযত বক্তব্য কিংবা একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে বা সংকট সমাধানে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিষয় বলে আসছেন—রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে যত আলোচনা হয়, তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব নিয়ে ততটা হয় না।

তাঁদের মতে, রাষ্ট্রপতি এমন একজন হওয়া উচিত, যিনি আইনের ভাষা যেমন বোঝেন, তেমনি রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বও বোঝেন। যিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধানের শপথকে জীবন্ত রাখবেন।

অনেক বিশেষজ্ঞ আরও মনে করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে যদি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুশীলন হিসেবে দেখা হয়, তাহলে পদটির নৈতিক উচ্চতা ক্ষুণ্ন হতে পারে। বরং এমন একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া উচিত, যাঁর প্রতি রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ব্যক্তিগত সততা, অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে।

এমন মতও রয়েছে যে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম পরামর্শ বা অনানুষ্ঠানিক ঐকমত্য তৈরি করা গেলে রাষ্ট্রপতির পদটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আরও শক্তিশালী হবে। সংবিধান তা বাধ্যতামূলক না করলেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য এটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।

রাজনীতির জন্যও এটি একটি সুযোগ

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন।

কেউ সংবিধান অনুযায়ী দ্রুত নির্বাচন চায়, কেউ বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলছে, কেউ আবার জাতীয় ঐকমত্যের কথা বলছে।

মতপার্থক্য গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে একটি বড় সুযোগও রয়েছে—তারা কি রাষ্ট্রপতির পদকে দলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে এনে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় দেখতে পারবে?

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রের শক্তি কোথায়?

রাষ্ট্রের শক্তি কোনো ব্যক্তি নন। রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠান।

শক্তিশালী সংসদ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর নির্বাচন কমিশন, জবাবদিহিমূলক সরকার এবং মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠান—এসব মিলেই গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি হয়।

প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ব্যক্তি যতই শক্তিশালী হোন, রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে ব্যক্তির পরিবর্তন রাষ্ট্রকে নাড়া দিতে পারে না।

এই কারণেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আসলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিরও প্রতিফলন।

অতঃপর: জনগণের প্রত্যাশা

এখন বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়, আবার খুব কমও নয়।

তারা চায়, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া হোক স্বচ্ছ, মর্যাদাপূর্ণ এবং বিতর্কমুক্ত। তারা চায়, নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করুক। তারা চায়, রাজনৈতিক দলগুলো প্রজ্ঞা ও সংযমের পরিচয় দিক। সর্বোপরি তারা চায়, রাষ্ট্রপতির আসনে এমন একজন বসুন, যিনি দলীয় পরিচয়ের আগে রাষ্ট্রের পরিচয়কে ধারণ করবেন।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি ক্ষমতার অলংকার নন, সংবিধানের অভিভাবক; যিনি রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ নন, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভারসাম্যের প্রতীক; যিনি নীরব থাকলেও তাঁর উপস্থিতি আস্থার জন্ম দেয়, আবার প্রয়োজন হলে সংবিধানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতেও দ্বিধা করেন না।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ তাই একটি সমাপ্তি নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সুযোগ—রাষ্ট্র কি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সত্যিই প্রতিষ্ঠাননির্ভর গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে প্রস্তুত? 

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়েছে—এটি একটি ঘটনা। কিন্তু এই শূন্যস্থান কীভাবে পূরণ হবে, সেটিই ইতিহাসে বড় হয়ে থাকবে। আর আমরা সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত দেখার অপেক্ষায়...।

লেখক : কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক।

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version