রেজাউল করিম খোকন ●
এখনও ডলারের সংকট কাটেনি। এ রকম পরিস্থিতিতে আয় বাড়াতে এবার বিদেশ থেকে ডলার আনার প্রক্রিয়া উদার করে দিয়েছে সরকার। এর আগে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার বা পাঁচ লাখ টাকার বেশি আয় পাঠাতে আয়ের নথিপত্র জমা দিতে হতো। যে কারণে এর চেয়ে বেশি অর্থ একবারে পাঠাতে পারতেন না বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশ থেকে তাঁদের অবাধে টাকা আনতে আর কোনো বাধা থাকবে না। এ নিয়ে বিদেশেও কেউ প্রশ্ন করবে না, আর দেশে তো করবেই না। সরকারের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পাঁচ হাজার ডলার অথবা পাঁচ লাখ টাকার বেশি প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্রদানে রেমিটারের কাগজপত্র বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা আছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৈধ উপায়ে দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণের বিপরীতে রেমিট্যান্স প্রণোদনা প্রদানে রেমিটারের কাগজপত্র ছাড়াই আড়াই শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে। ফলে প্রবাসী আয় বাবদ দেশে যত পরিমাণ ডলার পাঠানো হোক না কেন, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবে না এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো। আবার এর বিপরীতে আড়াই শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনাও দেওয়া হবে। এর ফলে দেশের প্রবাসী আয় বাড়বে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, দেশ থেকে যেসব টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে (পাচার হয়েছে), তা আবার ফেরত আসবে। বিদেশে টাকা রাখলে লাভের বদলে ব্যাংকগুলোকে সার্ভিস চার্জ বাবদ টাকা দিতে হয়। এতে লাভের চেয়ে লোকসান বেশি হয়। এরপরই সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে দেশে প্রবাসী আয় বাড়বে। কিন্তু প্রকৃত উপকার পাবেন দুর্নীতিবাজ আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। তাঁরা অবৈধ টাকা বিদেশে পাঠিয়ে বৈধ চ্যানেলে তা দেশে নিয়ে আসবেন। এতে তাঁদের কালো টাকা সাদা হয়ে যাবে। তবে সংকট কাটাতে এই অর্থ দেশের জন্য উপকারে আসবে। কারণ, ডলারের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে ডলার প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় দিয়ে আমদানি দায় শোধ করা যাচ্ছে না। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্য, জ্বালানি, মূলধনি যন্ত্র ও কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজভাড়াও। এতে সংকট হয়েছে ডলারের। বেড়ে গেছে ডলারের দামও। যার প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্যের দামে। চাপে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি।সংকট কাটাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ সফর বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। আর ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরও বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস ব্যবহার্য পণ্য আমদানিতে ৭০ শতাংশ টাকা জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিলাসপণ্য আমদানি বন্ধের চিন্তাভাবনা চলছে সরকারি পর্যায়ে। ইতিমধ্যে ডলারসংকট কাটাতে গাড়ি, মুঠোফোন, সিগারেটসহ ৩৮ পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে পাকিস্তান। বিদেশে সেবা পরিচালনা করা বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম মেনে তারা অর্থ স্থানান্তর সেবা দিয়ে থাকে। এ জন্য প্রতিটি দেশে সীমা নির্ধারণ করা আছে। আবার কোম্পানিগুলো ঝুঁকি বিবেচনা করেও সীমা নির্ধারণ করে থাকে। ফলে সরকারের এই সিদ্ধান্ত কতটা কাজে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে। এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে প্রবাসী আয় বেড়ে যাবে বলে আশা করছেন ব্যাংকাররা। পাশাপাশি ঈদুল আজহার কারণে আয় এমনিতেই বাড়বে বলে আশা করা যায়। তখন সংকট অনেকটা কেটে যাবে। নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশে প্রবাসী আয়ে বড় উলম্ফন হতে পারে । দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা, এ সময়ে ডলার আনতে এই সিদ্ধান্ত দেশের ও জনগণের জন্য ভালো হবে। দেশ থেকে অবৈধভাবে যাওয়া ডলার হোক আর প্রবাসীদের আয় হোক, তা দেশে এলে সবার উপকার হবে। আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কানাডাসহ অনেক উন্নত দেশ ডলারকে স্বাগত জানায়। আমাদের জানালেও সমস্যা নেই। ডলার সংকট কেটে গেলে জিনিসপত্রের দামও কমে আসবে। দেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মজুদ বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে সরকারী ব্যয়ে লাগাম টানার অংশ হিসেবে জরুরী ছাড়া নতুন কোনো প্রকল্প না নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিলাস পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারী-স্বায়ত্তশাসিত, সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। অস্থিতিশীল ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে কমানো হয়েছে টাকার মান। একই সঙ্গে রেমিটেন্স পাঠানোর পথও সহজ করে দিলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া আমদানির বিকল্প ফসল হিসেবে ডাল, তেলবীজ, মসলা জাতীয় ফসল ও ভুট্টা চাষে ভর্তুকির আওতায় ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্য দেশে উৎপাদন বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও ডলার চাপ কমাতে সরকারের সুদ ক্ষতিপূরণ সুবিধার আওতায় ব্যাংকগুলোকে রেয়াতি সুদ হারে ঋণ বিতরণের এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
করোনার স্বাভাবিক হওয়ার পর সব ধরনের পণ্যের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। সেই চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সবশেষ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পণ্য সরবরাহ বিঘিœত হওয়ায় আরও চড়ছে দাম। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে নতুন উচ্চতায় উঠেছে। মহামারীর পর চাহিদা বাড়ায় জ্বালানি তেল ছাড়াও খাদ্যপণ্য (বিশেষ করে গম), ভোজ্য তেল, শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি), শিল্পের মধ্যবর্তী কাঁচামালসহ সব ধরনের জিনিসের দামই বেড়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে জুলাই-মার্চ সময়ে মোট আমদানি ব্যয়ের ৭০ শতাংশের মতো খরচ হয়েছে রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও অন্য পণ্য আমদানিতে। একই সঙ্গে এ খাতে নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিও বেড়েছে। আমদানিতে বেশ চাপে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। ব্যালান্স অফ পেমেন্ট ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অস্থির হয়ে উঠেছে ডলারের বাজার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বাজারে ছাড়া হয়েছে। কিন্তু আমদানি বাড়ায় তারপরও চাহিদা মিটছে না। সাধারণভাবে অর্থনীতিতে আমদানি বাড়াকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়ে থাকে। বলা হয়, আমদানি বাড়লে দেশে বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান বাড়ে। ৫০ শতাংশ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির নেই। এখন এটা কমাতেই হবে। তা না হলে বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়বে আমাদের অর্থনীতি।দাম বাড়ায় সরকারের জ্বালানি তেলে ভর্তুকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে গ্যাসে ভর্তুকি বেড়েছে, সারে বেড়েছে। বিদ্যুতেও বেড়েছে। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এবার ভর্তুকি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ পড়বে। আমাদের রফতানি আয় বাড়ছে। এটা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করতেই হবে আমাদের। এখন বিলাসবহুল ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য যাতে আমদানি না হয়, সেদিকে সরকারকে কঠোর হতে হবে। দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার বিপরীতে ডলার সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণে আরও কড়াকড়ি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানি ব্যয় কমাতে ১৩৫ ধরনরে বিলাসবহুল পণ্যরে ওপর ২০ শতাংশ নয়িন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়ছে। সরকারি এ সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশি ফলমূল, ফুল, প্রসাধন সামগ্রী, আসবারপত্র, গাড়ি ও গাড়ির ইঞ্জিন, যন্ত্রাংশ, রড ও লোহা জাতীয় পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত হবে। এতে করে ডলাররে ওপর চাপ কমে বাংলাদশে ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে বলে মনে করছনে সংশ্লিষ্টরা। পণ্যগুলো আমদানতিে শুল্ক বাড়ানোর ফলে আরও অতিরিক্ত দরে হাজার কোটি টাকার মতো রাজস্ব পাবে এবিআর। বিলাসবহুল গাড়ি ও ইলেক্ট্রনিক পণ্য আমদানিতে ৭০ শতাংশ নগদ জমার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার-সঙ্কট সামাল দিতে গাড়ি, সেলফোন, সিগারেটসহ ৩৮ পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে পাকিস্তান। দেশটিতে ডলারের বিনিময় মূল্য এরই মধ্যে ২০০ রূপি ছাড়িয়েছে। এ কারণে সঙ্কট সামাল দিতে বিলাসপণ্য আমদানি নিষিদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশেও সাময়িক সময়ের জন্য বিলাসপণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। আমদানির চাপ কমাতে এই পরিস্থিতিতে কিছুদিনের জন্য বিলাসপণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলা বন্ধ করে দিতে হবে। যেসব ঋণপত্র খোলা হয়েছে, তাও বাতিল করতে হবে। যেসব খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য দেশে উৎপাদিত হচ্ছে, আপাতত সেসব পণ্য আমদানি বন্ধ করা যেতে পারে। আয় বাড়াতে সাময়িক সময়ের জন্য প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা বাড়ানো যেতে পারে। পোশাকের যে রফতানি আয় আটকে আছে, তার প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। এতে আয় বাড়বে। আর খোলাবাজারে ডলারের দাম এত বাড়ল কেন, তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা খতিয়ে দেখতে পারে। কেউ বেশি মুনাফার আশায় মজুদ করছে কি না, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। বিদেশে গিয়ে বা দেশে বসে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে এ ধরনের কোন কার্যক্রমে অংশ নিতে বা এ খাতে কোন ডলার ছাড় না করতে সরকারী-স্বায়ত্তশাসিত, সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।সরকারী-বেসরকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নির্দেশনার ফলে সরকারী-বেসরকারী খাতের কোন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসিয়াল কোন কাজে বিদেশ যেতে পারবেন না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মজুদ বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগগুলো সফল হলে অর্থনীতিতে অস্বস্তি ,অস্থিরতা কেটে স্বস্তি ফিরে আসবে, সমৃদ্ধির ধারা বজায় থাকবে। ●
অকা/নিলে/ রাত, ৩১ মে, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
লেখক সাবেক ব্যাংকার, কথাসাহিত্যিক ও নিয়মিত লেখক
ananno86bolly@gmail.com
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

