অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
আসন্ন রমজানে ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে সরকার এ বছর আগেভাগেই একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা হয়েছে, পাশাপাশি রোজাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে পর্যাপ্ত ও নিরাপদ মজুত। বিশ্ববাজারেও বর্তমানে বেশির ভাগ ভোগ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকায় দেশে জোগান ও সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও—শবেবরাতের পর রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে রোজার প্রধান পণ্যের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি।
তবে সামগ্রিক সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও রোজায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কয়েকটি পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি রয়েছে। পেঁয়াজ, খেজুর, মসুর ডাল ও সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে দুধের দামেও বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে—প্রতি কেজি দুধ কিনতে ক্রেতাকে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। এসব কারণে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না অনেক ভোক্তা।
রাজধানীর কাওরানবাজার, নয়াবাজার, মালিবাগ কাঁচাবাজার ও জিনজিরা বাজার ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ৯৫ টাকায়, যেখানে গত বছর একই সময়ে এর দাম ছিল ১১৫ থেকে ১৩০ টাকা। ভরা মৌসুমে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬৫ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা গত বছরের কাছাকাছি। তবে সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন—বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে গত বছর রোজার আগে এর দাম ছিল ১৭৬ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দামও বেড়ে প্রতি লিটার ১৮৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মসুর ডালের বাজারেও দাম কিছুটা চড়া। সরু মসুর ডাল প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ১৪০ টাকা। মাঝারি আকারের মসুর ডালের দাম ১২০ টাকা এবং মোটা দানার মসুর ডাল ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, চিনির দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে খোলা চিনি প্রতি কেজি ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে গত বছর একই সময়ে দাম ছিল ১২৫ টাকা। অন্যদিকে গুঁড়া প্যাকেটজাত দুধের দাম বেড়ে গেছে—ডিপ্লোমা ব্র্যান্ডের প্রতি কেজি দুধ বিক্রি হচ্ছে ৯২০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৮৪০ টাকা।
কাওরানবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “এবার শবেবরাতের আগে ও পরের দিন বাজারে হঠাৎ করে দাম বাড়েনি, সরবরাহও ভালো। কিন্তু গত বছরের তুলনায় দাম কিছুটা বেশি। তাই সামনে রোজায় কী হবে, সেটা নিয়ে চিন্তা থেকেই যায়।”
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও বাজারে নজরদারির ঘাটতি থাকলে দাম বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজানে পণ্যমূল্য বাড়ার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয় অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে। তাঁর মতে, বাজারে যে পরিমাণ পণ্য রয়েছে, তাতে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দাম বাড়ার কথা নয়। গত বছরের তুলনায় কেন কিছু পণ্যের দাম বেশি—তা খতিয়ে দেখে নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগ জরুরি।
এদিকে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এ বছর নিত্যপণ্যের গড় আমদানি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হয়েছে। এই বাড়তি সরবরাহ ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় রমজানে বেশ কিছু পণ্যের দাম আরও কমতে পারে। তিনি বলেন, “সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজারও স্বস্তিদায়ক থাকবে। কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সব মিলিয়ে, রোজার বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি এবার তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি ভোক্তাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করছে। বাজার তদারকি জোরদার করা গেলে এবং মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে, রমজানজুড়ে দাম স্থিতিশীল রাখার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

