অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
ধারাবাহিক উন্নতির পর এবার সংশোধন চলছে পুঁজি বাজারে। ২৭ জুলাই সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজি বাজারই বড় ধরনের সূচক হারায়। গত সপ্তাহের শেষদিন থেকে এ সংশোধনের শুরু হলেও ওই দিন আর্থিক খাতগুলোর মূল্যবৃদ্ধি সূচকের পতন ঠেকিয়ে দেয়। ২৭ জুলাই বীমা খাতের প্রায় সব কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেও বাজারের পতন ঠেকাতে পারেনি। দিনশেষে দুই পুঁজি বাজারের প্রতিটি সূচকের বড় ধরনের অবনতি ঘটে।
নানা অনিয়ম ও কারসাজির কারণে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যাওয়া পুঁজি বাজার দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক পতনের মধ্যে ছিল। গত বছরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সাময়িকভাবে বাজারগুলো ঘুরে দাঁড়াতে গেলেও বিগত সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া আর্থিক খাতের ব্যাপক অনিয়মের প্রভাবে আবারো পতন ঘটতে থাকে পুঁজি বাজার সূচকের। এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ মে দেশের প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নেমে আসে ৪ হাজার ৬১৫ দশমিক ৪০ পয়েন্টে। এটি ছিল দুই বছরের মধ্যে ডিএসই সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান। তবে এ সময় দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাজার পরিস্থিতির ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটায়।
জুন মাসের প্রথম দিকে জাতীয় বাজেটে পুঁজি বাজারের জন্য কিছু প্রণোদনা রাখা হয়। এর পর থেকেই মূলত বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচকটি পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩৯২ দশমিক ০৪ পয়েন্টে। সে হিসেবে দু’মাসেরও কম সময়ে ডিএসই সূচকের উন্নতি ঘটে ৭৭৬ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট। ২৭ জুলাই সেই বৃদ্ধি পাওয়া সূচক থেকে একটি অংশ হারায় ডিএসই। ২৭ জুলাই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৭ দশমিক ২১ পয়েন্ট হ্রাস পায়। আগের দিনের ৫ হাজার ৩৯২ দশমিক ০৪ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ২৭ জুলাই নেমে আসে ৫ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৮২ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৩১ দমমিক ৬২ ও ৮ দশমিক ১৩ পয়েন্ট।
একই সময় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিূক মূল্যসূচক ৪৯ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। বাজারটির অন্য দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৫২ দশমিক ০৪ ও ৩২ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট।
সূচকের অবনতির ফলে লেনদেনও কম হয় পুঁজি বাজারগুলোতে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ২৭ জুলাই ৮৬৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৮৬ কোটি টাকা কম। ২৪ জুলাই ডিএসইর লেনদেন ছিল ৯৫১ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারের লেনদেন নেমে আসে ৫৬ কোটি টাকা থেকে ১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকায়।
এ দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। পুঁজি বাজারের সঙ্কট নিরসনে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তির নির্দেশনার অংশ হিসেবেই আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডকে (এপিএসসিএল) শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ল্েয ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপরে কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদপে নেয়ার জন্য চিঠিও পাঠিয়েছে।
২৪ জুলাই ডিএসইর চেয়ারম্যান ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের কর্মকর্তাদের সাথে একটি বৈঠক করেন। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি একটি ৪০০ মেগাওয়াট মতাসম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল (পূর্ব) বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়নের জন্য বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এই অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক নথিপত্র প্রস্তুত রাখতে সহায়ক হয়েছে, যা তাদের দ্রুত তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ডিএসইর চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম জানান, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ইতোমধ্যে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তির আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং প্রতিষ্ঠানটির আসন্ন বোর্ড সভায় তালিকাভুক্তির প্রস্তাব তোলা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, কোম্পানিটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী এবং এটি নিয়মিত লাভজনকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যাচ্ছে। তাই ডিএসই এপিএসসিএলকে তালিকাভুক্তিতে সকল প্রকার প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দেবে। এ উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনার বাস্তবায়নের একটি বড় পদপে। পুঁজি বাজার সঙ্কট যখন চরম আকার ধারণ করে তখন চলতি সালের ১১ মে তিনি শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত এবং সরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালিত লাভজনক কোম্পানিগুলোকে শেয়ার বাজারে আনার নির্দেশনা দেন যাতে বাজারে শেয়ারের প্রবাহ বাড়ে এবং পুঁজি বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পায়।
আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে থাকে। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৩৭২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা ১৩৭ কোটি ২৬ লাখ শেয়ারে বিভক্ত। এর মধ্যে বিপিডিবির মালিকানা ৯১.০১ শতাংশ (১২৪ কোটি ৯২ লাখ শেয়ার) এবং বিদ্যুৎ বিভাগের মালিকানা ৮.৯৯ শতাংশ (১২ কোটি ৩১ লাখ শেয়ার)।
১৯৬৬ সালে দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০ সালে প্রথম দু’টি ইউনিট চালু করে। পরে ১৯৮৬-৮৭ সালে তিনটি ১৫০ মেগাওয়াট ইউনিট এবং বিভিন্ন সময়ে আরো কয়েকটি গ্যাস ও স্টিম টারবাইন সংযুক্ত করে মতা বাড়ানো হয়। বর্তমানে এটির মোট উৎপাদন সমতা ১ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরে কোম্পানিটি জাতীয় গ্রিডে ৭ হাজার ৫৭১ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯.৩৯ শতাংশ বেশি।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরে কোম্পানিটি ৪৮৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যার শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৩ টাকা ৫৭ পয়সা। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, কারণ ২০২২-২৩ অর্থ বছরে মুনাফা ছিল ২৪৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং ইপিএস ছিল ১ টাকা ৭৮ পয়সা। একই সময়ে রাজস্ব ৩৩.৩৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায়।
২০২৫ অর্থ বছরের প্রথমার্ধেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে কোম্পানির নিট মুনাফা ২০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩২১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং ইপিএস হয়েছে ২ টাকা ৩৪ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ২৬৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং ইপিএস ছিল ১ টাকা ৯৬ পয়সা। একই সময় কোম্পানির রাজস্বও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/২৭ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

