আলী ইমাম মজুমদার

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নিয়ে কয়েক বছর ধরে বিভিন্নমুখী বিতর্ক এখনও চলছে। এর ওপর সুদের হার কমানোর প্রস্তাব আসছে অনেকদিন ধরেই। দেশের অর্থনীতিতে এর ভূমিকা ও অবদান অনেক। জাতীয় সঞ্চয়পত্র জনগণের কাছে সংসার নির্বাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ পণ্য।  ২০২০-২১ অর্থ বছরে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এতে সরকারের দায় বাড়ছে। গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত মুনাফা। এ ব্যবস্থা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ প্রতিবাদী। শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরাও এর মুনাফার হার কমাতে বিভিন্ন ফোরামে দাবি জানাচ্ছেন। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার কম সুদে টাকা ধার করতে পারত। দায় কম হতো সরকারের।

কথাগুলো অসত্য, এমনটা বলা যাবে না। তবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার বিরুদ্ধেও জোরালো মতামত আছে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বাড়ছে দিন দিন। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল সরকার। ২০২০-২১ অর্থ বছরে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পরিমাণ ২৬ হাজার কোটি টাকার মতো। মহামারির জন্য ঘাটতি মোকাবেলায় ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বাড়বে বলে মনে হচ্ছে! তথ্যটি ঢাকার একটি বাংলা দৈনিকের। উল্লেখ করতে হয়, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের উপকারভোগীদের সিংহভাগ হলেন পেনশনভোগী, বৃদ্ধ, দুস্থ ও অসহায় নারী। অবশ্য ধনিক শ্রেণির কিছু লোকও অধিক মুনাফার সুযোগ নিয়ে এসব সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি উপেক্ষা করার মতোও নয়।

ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে মোটা দাগে ১০ ধরনের সঞ্চয়পত্র আছে। সঞ্চয় অধিদফতর ছাড়াও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও ডাক বিভাগ। দেখা দরকার, এত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর পুঁজি বাজার থাকতে বেশি পরিমাণ টাকা এদিকে ছুটছে কেন? ২০০৮-০৯-এর দিকে কিন্তু সঞ্চয় ব্যুরো প্রায় উজাড় হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে অনেকেই গেলেন পুঁজি বাজারে। সেখানে হাজার হাজার লোকের দেউলিয়া হওয়ার কাহিনী কারো অজানা নয়। ব্যাংকে স্থায়ী আমানতে বেশ বিনিয়োগ ছিল। সেখানে মুনাফার হার নেহাত কম ছিল না। কিন্তু বছর পাঁচেক আগে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কাছ থেকে জোর দাবি আসতে থাকে, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমাতে হবে। উচ্চ সুদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ছে না। উদ্যোক্তারা মুনাফা করতে পারছেন না। এক পর্যায়ে ব্যাংক মেয়াদি আমানতের সুদের হার কমাতে শুরু করল। বর্তমানেতো সে এখন তা অগ্রিম আয়কর ও বিভিন্ন ধরনের চার্জ বাদ দিলে মূল্যস্ফীতির বেশ নিচে। এসব কথাও সবারই জানা। তাই নিরুপায় আমানতকারীরা ছুটছেন সঞ্চয়পত্রের দিকে। সেখানেও বছর তিনেক আগে মুনাফার হার গড়ে ২ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে এখনো তা আছে ১১ শতাংশের কিছু ওপরে। অবশ্য অগ্রিম আয়করসহ অন্যান্য চার্জ মুনাফা থেকে কাটা হয়।

অভিযোগ আছে, অনেক সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে অধিক মুনাফা করছে। সেগুলো কিংবা বড় অঙ্কের আমানতকারীদের বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে সরকার তাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থার কথা ভাবছে। তবে তাদের চিহ্নিত করতে হলে গোটা সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করতে হবে। এটা সম্ভব ও খুব ব্যয় বা সময়সাধ্যও নয়। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকায় যাঁদের ওষুধ কিনতে হয়, এর মুনাফা ছাড়া যাঁদের চুলায় আগুন জ্বলবে না, তাঁদের হৃৎস্পন্দন শুরু হয় এটা হ্রাসের কোনো সংবাদে। পেনশনভোগীরা জীবন-যৌবন ব্যয় করেছেন দেশের কাজে। এখন কাজ করার ক্ষমতা নেই। যাঁদের আছে, তাঁদেরই বা কাজ দেয় কে? পেনশন আর প্রভিডেন্ট ফান্ডে সঞ্চিত কয়েকটি টাকা বিনিয়োগের মুনাফা বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেই জীবন চলছে তাঁদের। সর্বশেষ জাতীয় বেতন কমিশনের সঙ্গে বৈঠককালে পেনশনভোগীরা দাবি জানিয়েছিলেন, কর্মরতদের বেতন ও অবসরজীবীদের পেনশন বাড়াতে হবে। কমিশন উদারভাবে সুপারিশও করেছিল। কিন্তু কর্মরত শীর্ষ ব্যক্তিরা নিজেদেরটা ঠিকই নিলেন। পেনশনভোগীদের দিলেন সুপারিশের অর্ধেক। তাঁদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১২ শতাংশ মুনাফার হারও কমেনি। এখন কম সুদে বাড়ি করার জন্য বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা হচ্ছে। সে প্রস্তাবনায় সুদেরও ৩ শতাংশ সরকার ভর্তুকি দেবে বলে সংবাদপত্রে দেখতে পেলাম। আমরা এটা সমর্থন করি। অবশ্য ব্যবস্থাটি আঁতুড়ঘরে। তাহলে সে ভর্তুকি তো সঞ্চয়পত্রেও হতে পারে।

২০০৮-০৯ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে মূলধন ঘাটতি মেটাতে। অবশ্য এটা ঋণ। শোধ হয়েছে কি কিছু? হওয়ার কথা নয়। বরং সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মূলধনের সিংহ ভাগ সরকারেরই দেয়া। সেগুলো কি তেমন কিছু মুনাফা দিয়েছে? দিয়ে থাকলেও বিনিয়োগকৃত মূলধনের বিবেচনায় নগণ্য, এটা জোর দিয়ে বলা যায়। বরং হাজার হাজার কোটি টাকার গ্রাহকের আমানত আজ খেলাপি হয়ে আছে। এর জন্য নিয়ম অনুযায়ী সঞ্চিতিও (প্রভিশন) রাখতে পারছে না লোকসানে থাকা অনেক সরকারি ব্যাংক। এটা ব্যাংক ব্যবস্থার জন্য একটি ঝুঁকিও সৃষ্টি করেছে। কার্যত ঝুঁকিটা সরকারের। তা-ও আমরা বলব না সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক উঠিয়ে দেয়ার কথা। সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের কয়েকজন খেলাপি সাম্প্রতিক কালে যে টাকা কার্যত আত্মসাৎ করলেন, সে বিবেচনায় এসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর কিছু অতিরিক্ত মুনাফা খুব বেশি নয়। বলা হয়েছিল, ব্যাংকঋণের সুদ কমলে বিনিয়োগ অনেক বাড়বে। বেড়েছে, তবে অনেক নয়। বরং বলা হচ্ছে, ব্যাংকগুলো অলস টাকার ওপর বসে আছে। আবার কারো মতে, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে বিনিয়োগ অনেক বাড়বে। সেটাই স্বাভাবিক। তখন ব্যাংকের টাকা দরকার হবে। আমানতকারীদের অধিক মুনাফা দিয়ে তা সংগ্রহ করতে হবে। যেমনটা আগে করত। তখন আপনা থেকেই হ্রাস পাবে সঞ্চয়পত্রের ওপর একক নির্ভরতা। পুঁজি বাজার আমাদের দেশে এখনো অপরিপক্ব। অল্প কিছু লোক এটাকে তাঁদের সুবিধামতো নামান-ওঠান। পরিণতিতে লাভ দূরে থাকুক, অনেকে মূলধনই হারিয়ে ফেলেন। এ অবস্থায় জীবনের শেষ সম্বল কটি টাকা নিয়ে কীভাবে এসব ব্যক্তি পুঁজি বাজারমুখী হতে সাহস করবেন? নিকট অতীতে দুবার বড় ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ধসের ধকল গেছে অনেকের ওপর। কেউ কেউ তো সব হারিয়ে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এ ক্ষেত্রে আস্থার ক্ষেত্র একমাত্র সঞ্চয়পত্র। আর এর  মুনাফার হার এখন যা আছে, তা হ্রাস করলে এসব বিনিয়োগকারী দুর্বিপাকে পড়বেন। ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের ধাক্কা সামলাতে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন। যাঁরা গোটা ব্যাপারটির গভীরে না গিয়ে শুধু সরকারি বাজেট বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর কথা বলেন, তাঁরা দয়া করে কয়েকটি দিন সঞ্চয় অধিদফতরের কয়েকটি শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো এ অসহায় মানুষগুলোকে দেখতে পারেন। তথ্য নিতে পারেন তাঁদের মুনাফা কীভাবে ব্যয় হয়। এটা কমলে তাঁদের পরিণতিইবা কী হবে? রাষ্ট্র তো বাণিজ্যিক সংস্থাও নয়। এর একটা মানবিক দিক আছে।

দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। পাশাপাশি আয় বৈষম্য বাড়ছে। একটা নমুনা জরিপ চালালেও প্রমাণিত হবে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফানির্ভর লোকগুলোর বিশাল অংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংশীদার নন। বরং উঁচু চাকরি থেকে অবসর নেয়া ব্যক্তিরা ক্রমান্বয়ে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে চলে যাচ্ছেন। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাবলয় খুবই দুর্বল। এদিকে নজর না দিলে আয়বৈষম্য ক্রমবর্ধমান হয়ে সামাজিক শৃঙ্খলাকে ব্যাহত করতে পারে। শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি হলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারও কিছু হ্রাস করা যাবে। তা না করে এতে হাত দিলে হাজার হাজার পরিবারের দুর্ভোগ বাড়বে এবং সামাজিক নিরাপত্তা আরো দুর্বল হবে। সঞ্চয়পত্র ব্যক্তির অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা হিসেবেও কাজ করছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার বিষয়টি শুধু বাজেটের আয়-ব্যয়ের হিসাবে না দেখে সামাজিক উপযোগিতার কথাও ভাবতে হবে। ●

লেখক মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব

অ/নি/লে/বিকেল, ২২ জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিঃ, ঢাকা

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version