অর্থকাগজ প্রতিবেদক

​নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের বরপুত্র, রূপালি পর্দার চিরসবুজ ইউথ আইকন চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন—যিনি সবার কাছে ‘সালমান শাহ’ নামে সমাদৃত—তাঁর অকালমৃত্যুর তিন দশক হতে চলল। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর আকস্মিক প্রয়াণের পর কেবল একজন জনপ্রিয় নায়কই হারিয়ে যাননি, বরং থমকে গিয়েছিল গোটা ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রির অগ্রযাত্রা। সেই অপূরণীয় ও ঐতিহাসিক ক্ষতির প্রভাব আজও বহন করে চলেছে দেশের চলচ্চিত্র শিল্প। এর মধ্যেই সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত খল অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনের গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
​অপূর্ণ প্রজেক্ট ও আর্থিক ও বিনিয়োগ ঝুঁকি: ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুর সময় সালমান শাহ বেশ কিছু নতুন সিনেমা ও ডাবিংয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন (যেমন—‘প্রেম পিয়াসী’ চলচ্চিত্রের ডাবিং তিনি মৃত্যুর ঠিক আগের দিনও করেছিলেন)। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে সেসব ছবির প্রযোজক ও পরিচালকরা চরম অনিশ্চয়তা ও বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। অনেক ছবির ক্ষেত্রে বিকল্প অভিনেতা দিয়ে কাজ শেষ করতে গিয়ে গল্পের মান বা চিত্রগ্রহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে চলচ্চিত্রে বড় অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করতেন প্রযোজকরা। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির প্রধান এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বক্স-অফিস ভরসাস্থল হঠাৎ চলে যাওয়ায় প্রযোজকদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি ও আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা নতুন বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত করে।
​‘কাটপিস সংস্কৃতি’র উত্থান এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাব: চলচ্চিত্র গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, সালমান শাহর মৃত্যুর পর ঢাকাই চলচ্চিত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা পূরণের মতো সমকক্ষ বা সমাদৃত কোনো তারকার দেখা মেলেনি। এই দর্শক খরা কাটাতে এবং হলগুলোতে দর্শক টিকিয়ে রাখতে তৎকালীন সময়ে কিছু অসাধু নির্মাতা সিনেমার ভেতরে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ দৃশ্য বা ‘কাটপিস’ সংযোজন শুরু করেন। কাটপিস সংস্কৃতির প্রাদুর্ভাবের কারণে সাধারণ ও পারিবারিক দর্শকরা ধীরে ধীরে হলবিমুখ হয়ে পড়েন, যা বাংলা সিনেমার সামাজিক ও নৈতিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সিনেমা হল বন্ধের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
​করপোরেট ও আধুনিক ধারা মুখ থুবড়ে পড়া: সালমান শাহ কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ঢালিউডের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘ইউথ আইকন’ বা তারকাকেন্দ্রিক ব্র্যান্ড। তাঁর ফ্যাশন, স্টাইল, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও অভিনয়রীতি তরুণ প্রজন্মকে যেভাবে আকৃষ্ট করেছিল, তার মৃত্যুতে সেই আধুনিক ও করপোরেট ধারার কমার্শিয়াল সিনেমার বিকাশ থমকে যায়। অভিনেতার আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যু সাধারণ দর্শক ও ভক্তদের হৃদয়ে গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা সৃষ্টি করেছিল। এই মানসিক দূরত্বও দর্শকের সাথে হলের সম্পর্ককে স্থবির করে দেয়।
​সুদীর্ঘ শূন্যতা ও উত্তরসূরি সংকট: সালমান শাহর মৃত্যুর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও ঢাকাই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আজও এমন একজন সর্বজনগ্রাহ্য ও চুম্বকীয় ব্যক্তিত্বের সন্ধান পায়নি, যিনি এককভাবে পুরো দেশের সিনেমাপ্রেমীদের প্রেক্ষাগৃহে টেনে আনতে পারেন। ইন্ডাস্ট্রির এই ‘তারকা সংকট’ বা ‘স্টার পাওয়ারের অভাব’ বর্তমান যুগের চলচ্চিত্রগুলোর বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারে টিকে থাকার ক্ষেত্রেও একটি বড় অন্তরায় হয়ে রয়েছে।
​ডনের গ্রেপ্তার ও মা নীলা চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া: আইনি লড়াইয়ের নতুন মোড়: সালমান শাহর মৃত্যুর সুদীর্ঘ ২৯ বছর পর আদালতের নির্দেশে এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। এই মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি ও খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাওয়ার প্রাক্কালে তাকে আটক করা হয়। ডনের এই গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বিচারের আশার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী।
​নীলা চৌধুরী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে বলেন, “সালমান আমার সন্তান। সে আমার বুকের মধ্যে আছে, থাকবে। তাকে হত্যা করা হয়েছে। আর সালমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল এই ডন। সালমানের মৃত্যুর পর সে আমাকে নানাভাবে অপমান করেছে এবং আমার ছেলের নামে অনেক মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। আজ সে গ্রেপ্তার হয়েছে, সব প্রমাণ একদিন হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান সরকারের প্রতি তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং তিনি আশাবাদী যে এই মামলার অন্য আসামিরাও গ্রেপ্তার হবে এবং তিনি তার সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার পাবেন।
​চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, ডনের গ্রেপ্তার এবং হত্যা মামলার আইনি কার্যক্রমের এই নতুন অগ্রগতি কেবল একটি মামলার মোড় পরিবর্তন নয়, বরং এটি তিন দশক ধরে ঝুলে থাকা ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় রহস্যের একটি সুরাহা টানার পথ প্রশস্ত করতে পারে। সালমান শাহর প্রয়াণে যে অপূরণীয় আর্থিক ও আদর্শিক ক্ষতি ইন্ডাস্ট্রির গায়ে লেগেছিল, আইনি এই বিচার সম্পন্ন হওয়াটা সেই ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হতে পারে বলে মনে করছেন বোদ্ধারা।

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version