অর্থকাগজ প্রতিবেদন

শেয়ার বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ)-কে নতুন কাঠামোয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ তহবিলের জন্ম হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের অদাবিকৃত লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার, অধিগ্রহণ ও মর্জার প্রক্রিয়ায় অনাদায়ী শেয়ার বা নগদ অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচ বছর পরও এর কাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব এবং অর্থ ব্যবহারে অস্পষ্টতা নিয়ে সমালোচনা চলছিল। বিনিয়োগকারীদের দাবি ছিল, এ তহবিল যেন প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের কল্যাণে কাজে লাগে, সরকারি খাতে স্থানান্তরের মাধ্যমে যাতে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিএমএসএফকে নতুন আইনি কাঠামোয় আনার বিষয়ে আলোচনা হয়। ২০২৫ সালের প্রস্তাবিত নতুন আইনের অধীনে এটি একটি বিধিবদ্ধ তহবিল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এ পরিবর্তনের ফলে তহবিল ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হবে এবং এর উপর আইনি জবাবদিহি বাড়বে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হবে, ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।

বর্তমানে সিএমএসএফ বিভিন্ন কোম্পানি থেকে নগদ প্রায় ৬৯৭ কোটি টাকা এবং ১৪ কোটি ৩৭ লাখ শেয়ার সংগ্রহ করেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের দাবি পূরণে এর অতি সামান্য অংশ ব্যবহার হয়েছে। এ অবস্থায় সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বিএসইসি সেটি প্রত্যাখ্যান করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, এ অর্থ বিনিয়োগকারীদের অধিকারভুক্ত হওয়ায় আইন অনুযায়ী তা সরকারি খাতে স্থানান্তর করা যাবে না। এ ঘটনার পর থেকেই সরকার সিএমএসএফের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য আইনগত সংস্কারের পথে হাঁটছে।

নতুন পরিকল্পনায় তহবিল পরিচালনার জন্য সাত সদস্যের একটি পর্ষদ গঠন করা হবে। এ পর্ষদের নেতৃত্ব দেবেন বিএসইসি চেয়ারম্যান এবং তার সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ তহবিল পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াবে। একইসঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে সিএমএসএফ-এর অফিস বিএসইসি বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার অধীনে আনা হবে।

এ তহবিল থেকে উপার্জিত অর্থ শুধু সংরক্ষণ বা প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যয় না হয়ে বিনিয়োগ শিক্ষা, আর্থিক সচেতনতা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি এটি একটি কেন্দ্রীয় ডিভিডেন্ড বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা সহজে তাদের প্রাপ্য অর্থ বা শেয়ার পেতে পারেন এবং ট্যাক্স ডিডাক্টেড অ্যাট সোর্স (টিডিএস) প্রক্রিয়াও সহজ হয়।

পুঁজি বাজার বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীরা সিএমএসএফকে একটি “নিষ্ক্রিয় ও অস্বচ্ছ তহবিল” হিসেবে দেখছিলেন। এর ফলে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “সিএমএসএফের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। নতুন আইনের আওতায় এ তহবিল আইনি ভিত্তি পেলে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে বাড়বে।” ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একজন সাবেক পরিচালক জানান, “কেন্দ্রীয় ডিভিডেন্ড বিতরণ ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে। বহু বিনিয়োগকারী বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে প্রাপ্য লভ্যাংশ পান না, সিএমএসএফ যদি সেই প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করে তবে আস্থা অনেকটা ফিরবে।”

শেয়ার বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ সংস্কারের ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসবে। তাদের মতে, “আস্থা ছাড়া পুঁজিবাজারে কোনো প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। সিএমএসএফকে স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করা গেলে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বাজারে প্রবেশে আগ্রহী হবেন।”

সব মিলিয়ে বলা যায়, সিএমএসএফকে ঘিরে যে সমালোচনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে তা অনেকাংশে কেটে যাবে। তহবিলটি বিনিয়োগকারীদের কল্যাণে কাজ করলে শুধু শেয়ার বাজারে আস্থা ফিরবে না, বরং বাংলাদেশের আর্থিক বাজারেও একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।
অকা/রা/ই/সকাল/২০আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 6 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version