চৌধুরী মো. শাহেদ ●
এক সময়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা দেশের চতুর্থ প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানি সোনালী লাইফে চলছে ঘোরতর অমানিশা ও চরম অস্থিরতা। সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর ‘সোনালী সুদিন’ আর নেই! অস্থিরতার মূলে রয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রকাশ্যে সততা ও স্বচ্ছতার কথা বলা হলেও পর্দার অন্তরালে চলছিল লুটপাটের মহোৎসব। একথা প্রমাণিত যে, দুর্নীতির পথ মসৃণ করতেই কতিপয় আনাড়ি কর্মকর্তার ওপর ভর করে চটকদার আইটির মাধ্যমে কোম্পানির গোড়াপত্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। আনাড়ি এই কর্মকর্তারা কখনো প্রাক্তন সিইও’র কাছের মানুষ, কখনো প্রাক্তন চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন, কখনো বর্তমান প্রশাসকের প্রিয় মানুষ ছিলেন এবং আছেন। আইটি কলাকৌশলটি যখন যিনি পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন, তখন তার হয়ে ফলাফল প্রদর্শন করে। চাটুকার কর্মকর্তাদের কাজ হলো নিজের মতো করে তথ্য পাচার করে উপরওয়ালাদের কান ভারি করা। সকল পক্ষই এই কানভারি তথ্যে সমৃদ্ধ হয়ে অবাধে দুর্নীতি করে নিজের আখের গুছিয়েছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় ও লোকমুখে প্রকাশ, প্রাক্তন সিইও প্রায় ২০০ কোটি টাকা, প্রাক্তন এক চেয়ারম্যান ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়েছেন! এছাড়া এদের সহযোগী হিসেবে প্রাক্তন আর এক সিইও’র নিকট আত্মীয়রা ৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন। তাদের বাঁচতে তিনি মরিয়া! প্রাক্তন চেয়ারম্যানের সুক্ষ ষড়যন্ত্রে তিনি সম্প্রতি সোনালী লাইফ থেকে বিতাড়িত। তাদের দুর্নীতি আড়াল করতে নিয়ম বর্হিভূতভাবে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের খুশিতে রেখেছেন। নিয়ম বহির্ভূতভাবে বেতন, কমিশন ও বিদেশ ভ্রমণ খাতে সাবেক পর্ষদ ও প্রাক্তন সিইও খরচ করেছেন ১,০০০ কোটি টাকার উপরে। আস্থাভাজন তোষামোদকারীরাও পিছিয়ে নেই। এদের কেউ কোম্পানির নগদ টাকা নিজের শেয়ার ব্যবসায়ে লগ্নী করে একুরিয়াম ফার্ম ও হোটেল ব্যবসার মালিক, কেউ আইটি এক্সেসরিজ ক্রয় ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কাজের কমিশন বাণিজ্য দ্বারা নিজেই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের মালিক বনে গেছেন, কেউ কেউ কোম্পানির পিকনিক ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কেনাকাটায় ভূয়া ভাউচার বানিয়ে হাতানো টাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ক্রয় ও ছাগলের ফার্ম দিয়েছেন। কেউ আবার প্রাক্তন সিইওকে মহিলা আত্মীয় গছিয়ে দিয়ে ওই সিইওর বউকে তালাক দিতে সাহায্য করেছেন। কেউ আবার অদক্ষ এফএ, ইউনিট ম্যানেজারদের নিয়োগ বাণিজ্যে লিপ্ত। প্রত্যেকটা ঘটনার পিছনে মূল কারণ কতিপয়ের দুর্নীতি, চাটুকাারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার। সরকারি প্রতিষ্ঠান আইডিআরএ’র সংশ্লিষ্টরা ধোয়া তুলসীপাতা নন। তারাও এসব দুর্নীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুবিধাভোগী। বাজারে গুজব আছে- একজনকে বীমা কোম্পানির সিইও হতে হলে আইডিআরের পিছনে ২০ লাখ টাকা অবধি খরচ করতে হয়। এ অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। না হলে বয়স ও অভিজ্ঞতায় অযোগ্যরা বছরের পর বছর অবৈধভাবে চলতি দায়িত্ব নিয়ে মূল বীমা ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা, অন্য কোম্পানির ছাড়পত্রহীন কর্মকর্তা থাকা, কোম্পানির বাইরে ব্যবসায়ে নিযুক্ত থেকে প্রধান নির্বাহী বীমা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন ছাড়াও ভূয়া সনদে বীমা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমোদন কিভাবে সম্ভব হচ্ছে? জানা গেছে, সোনালী লাইফের প্রাক্তন সিইও’র নিয়োগেও নাকি অর্ধ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে! এই সিইও’র স্নাতকোত্তর সনদও ভূয়া বলে কাগজে খবর প্রকাশ পেয়েছে।
জানা গেছে, আইডিআরএ’র বিতর্কিত সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোশাররফ হোসেনের সময়ে এই সিইও চেয়ারম্যান, সদস্য ও পরিচালককে (লাইফ) কুরবানীর উপহারস্বরূপ ৮, ৬ ও ৫ লাখ টাকা মূল্যের ষাঁড় কিনে পাঠিয়েছিলেন। তাছাড়া মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বিভিন্ন কোম্পানিতে নিকট আত্মীয়দের চাকরি দেওয়া ছাড়াও কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যান ও সিইও’র কাছ থেকে গোপনে নানা সহযোগিতা গ্রহণ করে থাকেন। দেখা যায়, দাবীর চেক বিতরণে যুক্ত হন তারা ‘প্যাকেটের’ বিনিময়ে। কোম্পানির টাকায় দেশ-বিদেশ ভ্রমণতো আছেই! সোনালী লাইফের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। দুদক ও বিএফআইইউ’র (বাংলাদেশ ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল ইউনিট) সহায়তায় সকল অনিয়ম ও দুর্নীতি চিহ্নিত করে এদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব।
এদিকে কজন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করায় সোনালী লাইফের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা কদিন ধরে কর্মবিরতিতে রয়েছেন। এই যখন দেশের একটি নতুন প্রজন্মের বীমা কোম্পানির অবস্থা, সেখানে বীমা বিষয়ে অনভিজ্ঞ প্রশাসক দিয়ে কিভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে?
সোনালী লাইফের পরিচালনার বিষয়টি এখন আদালতের এখতিয়ারধীন। যদিও আদালতের আদেশেই বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ৬ মাসের জন্য একজন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে; যিনি তিনজন সহযোগী দ্বারা সার্বক্ষণিক পরিচালিত, তাকে নিয়ে সোনালী লাইফের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান হবে মনে হচ্ছে না। কোম্পানি পরিচালনায় যিনি থাকুন না কেন, তার প্রধান কাজ হলো কোম্পানিকে সচল রেখে সমস্যার সমাধানে হাত দেয়া। তিনি কাজগুলোকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সম্পাদন করার জন্য অন্যদের কাজের ভাগ করে দিতে পারেন। ব্যবসা ও দাবী পরিশোধের কার্যক্রমকে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ও দুর্নীতির মূল উৎপাটনকে ইনডাইরেক্ট অ্যাকশন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ, ব্যবসা ও দাবী কার্যক্রমের সঙ্গে গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জড়িত। অপরদিকে, ভবিষ্যত মসৃণ ও স্থিতিশীল করতে দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। একই সঙ্গে সকল চাটুকার ও সোর্সদের চাকরিচ্যুত করাও একান্ত প্রয়োজন। হতে পারে আগের পরিচালন পদ্ধতিতে অধিক বেতন ও কমিশন ব্যয় হয়েছে। কিন্তু, উন্নয়ন কর্মকর্তারাতো তা জোর করে নিচ্ছেন না। ব্যবসা করে লাভ নিচ্ছেন। আইনানুগ না হলে তারা এই অতিরিক্ত অর্থ দাবী না করে নিজেরাই সরে যাবেন। তাই জোর জবরদস্তির দরকার পড়ে না। আজ প্রায় আড়াই মাস চলল, সোনালী লাইফে প্রশাসক পদে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) কে এম ফেরদৌস যোগদান করেছেন। তিনি আজ অবধি উন্নয়ন কর্মকর্তাদের দেখাতে সক্ষম হননি- কোন অনিয়মের কারণে তারা বেশী বেতন-কমিশন নিচ্ছেন। অথচ গত ২ মাস যাবত তিনি উন্নয়ন কর্মকর্তাদের বেতন-কমিশন বন্ধ করে রেখেছেন। যার বা যাদের পরামর্শে তিনি এই কাজ করেছেন, তাদের বিদ্যা-বুদ্ধি যাচাই যদি না করতে পারেন, তাহলে তো তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এর প্রতিক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিল ও শেষমেশ অফিস কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের ধর্মঘট সংঘটিত হচ্ছে। অথচ তিনি যোগদান করেই যদি আগের নিয়মে ব্যবসা সচল রেখে যথাযথ সরকারি বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চালাতেন, তাহলে এখনকার এই পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। দুর্নীতিবাজদের ধরার জন্য দেশে স্বনামধন্য নিরীক্ষা ফার্ম, বিএফআইইউ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যথাযথ ব্যবহার দ্বারা অনায়াসে চিহ্নিত করে এখনও আইনের অধীনে আনা সম্ভব।
সাম্প্রতিককালে দেশের কটি জীবন বীমা কোম্পানির নেতিবাচক কার্যক্রম গোটা বীমা খাতে ইমেজ সংকট তৈরি করেছে। মাঠ পর্যায়ে দেশি কোম্পানির কর্মীরা ব্যবসা করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছেন। দাবী সময়মত পরিশোধ করতে না পেরে বীমা কর্মীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নন লাইফেও এর নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে বীমা খাতে আস্থার সংকট আরও তৈরি হচ্ছে দিনের পর দিন।
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর নিকট অতীতের সুদিন ফিরিয়ে আনতে হলে নিচের কাজগুলো করতে হবে।
১। আগের নিয়মে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের সকল বেতন-কমিশন আজই পরিশোধ করা। বীমা বিষয়ে জানা প্রশাসক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
২। একজন ভাল একচুয়ারী দিয়ে প্রদেয় বেতন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ ময়না তদন্ত করে করে সঠিক হিসাব পদ্ধতিতে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের বেতন-কমিশন চালু করা।
৩। নিরপেক্ষ ও সৎ প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (সিএফও) নিয়োগ দান। বীমায় অশিক্ষিত এবং তোষামোদি চাটুকারদের অব্যাহতিদান।
৪। প্রশাসকের নিজের অত্যধিক বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিহার করা।
৫। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের আগের স্বাচ্ছন্দ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
৬। আগ্রাসী বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকা। ৬ স্তরের (টায়ার) বাইরে ব্যবসা থেকে বিরত থাকা।
৭। আইনের সুশাসন নিশ্চিত করা। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বর্জন করা
৮। পর্ষদের অনুমোদনে ব্যাংক-বীমা বিষয়ে অভিজ্ঞ পেশাজীবী যেমন বীমা বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার, বাণিজ্য বিষয়ের অধ্যাপক এবং অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিকদের নিয়ে গঠিত উপ কমিটি নামে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা। যারা মাসে কোম্পানির সমস্যা সমাধানে কমপক্ষে একবার বৈঠকে মিলিত হবেন।
৯। চটকদার পণ্য বাতিল, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানির মতো বীমা ব্যবসা বন্ধ করা। আস্থা বাড়াতে নবায়ন ব্যবসায় গুরুত্ব দেওয়া।
১০। ছাড়পত্র ছাড়া নিয়োগ পরিহার করা। মালিক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার কোডের মাধ্যমে ব্যাংক হিসেবে কমিশন বা অন্য সুবিধা বন্ধ করা।
অনিয়ম ও দুর্নীতি উৎপাটনসহ উল্লেখিত বিষয়গুলোর কার্যকর সমাধান করা হলে শুধু সোনালী কেন; সকল বীমা কোম্পানিতেই সোনালী সুদিন বইবে। তাতে দেশের অর্থনীতি হবে মজুবত। সোনালী লাইফের সুদিন ফিরে আসুক আমরাও সে প্রত্যাশাই করছি। ●
অকা/বীখা/বিপ্র/ ভোর, ১৫ জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

