শিপন হালদার ●
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলাও চালাচ্ছে তেহরান। অনেকে বলছেন, অঘোষিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধ সহসাই থামছে না। এমন বাস্তবতায় অতিগুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালী শুধু একটি জলপথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, শক্তি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম চাবিকাঠি।
হরমুজ প্রণালী হলো মধ্যপ্রাচ্যের ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরের মধ্যে একটি সরু জলপথ। এটি প্রায় ৫৬ কিলোমিটার চওড়া। প্রণালীর একপাশে ইরান, অন্যপাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিশ্বের প্রধান তেল রফতানির পথ। প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) এর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে যেত; যা প্রতিবছর সমুদ্রপথে পরিবহন করা প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের জ্বালানি বাণিজ্যের সমতুল্য। এটি বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। একইসঙ্গে এই জলপথ দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসেরও (এলএনজি) ২০ শতাংশ সরবরাহ হয়ে থাকে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পরপরই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে, যা একদিনেই প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি। মূলত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কায় দামের এই উল্লম্ফন।
সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে রপ্তানি করে। এই পরিমাণ সৌদি আরবের যে কোনও প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি। জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থা ভোরটেক্সার হিসাবে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসেবমতে, তুলনামূলকভাবে ইরান প্রতিদিন রপ্তানি করে ১৭ লাখ ব্যারেল তেল। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া হিসাবমতে, ২০২৫ সালের অর্থবছরে ইরান ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি করেছে। গত এক দশকের মধ্যে এটিই ছিল ইরানের সবচেয়ে বেশি তেল রাজস্ব।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে এই বিপুল বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। ক্ষতির মুখে পড়বে এশিয়াও। ভোরটেক্সার হিসেবে, ২০২২ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায় ৮২ শতাংশ অশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়েছে।
বিশ্ববাজারের জন্য ইরানের রপ্তানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ কেনে চীন একাই। এই প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে চীনের জ্বালানি ও পরিবহণ খরচ বাড়বে। আবার প্রভাব ফেলবে ভোক্তাদের ওপর। বিশ্বজুড়ে বাড়বে মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। এই আমদানির পুরোটাই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাংলাদেশকে একযোগে মোকাবিলা করতে হতে পারে জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতির মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারণ, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা মাত্র ১৪ লাখ টন, যা দেশের সর্বোচ্চ ৪৫ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ কমলেও তার সুফল বাংলাদেশে পৌঁছাতে সময় লাগে। আবার বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে দেশে সংকট তৈরি হয়। যার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, গণপরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং গণপরিবহনের ৯০ শতাংশই জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল।
তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি খাতেই প্রভাব পড়ে না, এটি অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আর এতে নাভিশ্বাস ওঠে সাধারণ মানুষের।
এমন বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে দ্রুত বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করতে হবে। সরবরাহ ঠিক রাখতে এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর বর্তমান রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় এখনই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ●
অকা/নিলে/ই/বিকেল/৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
লেখক সিনিয়র সাংবাদিক
write2shipon@gmail.com
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে

