অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বৈশ্বিক মন্দা, অর্থনীতিতে ধীরগতি, সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ২০২৩-২৪ অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল সর্বনিম্নমুখী। যদিও সাময়িক হিসাবে প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখিয়ে ছিল শেখ হাসিনা সরকার। তবে চূড়ান্ত হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে। এর আগে করোনার কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছর প্রবৃদ্ধি হার ছিল সর্বনিম্ন।
গতকাল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করা, আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ ও এলসি খোলা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়া প্রভৃতি কারণে ওই অর্থবছর শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পায়। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়াসহ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে গত অর্থবছর এ প্রবৃদ্ধি আরও হ্রাস পায়।
এদিকে সরকারি ব্যয় কমানো ও কৃচ্ছ সাধন নীতি অনুসরণ এবং এর প্রভাবে আয় হ্রাস পাওয়ায় সার্বিকভাবে সেবা খাতে মন্দাভাব দেখা দেয়। ফলে এ খাতেও নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে গত দুই অর্থবছর। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছর কৃষিতে প্রবৃদ্ধি সামান্য বাড়লেও গত অর্থবছর তা আবার কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার প্রভাবই দেখা গেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির চিত্রে।
বিবিএসের প্রকাশিত হিসাবে দেখা যায়, গত অর্থবছর দেশের কৃষি উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে তিন দশমিক ৩০ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যেটি আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতে গত অর্থবছর প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে তিন দশমিক ৫১ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছর এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ২০২১-২২ অর্থবছর ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সেবা খাতে গত অর্থবছর প্রবৃদ্ধি কমলেও শিল্প ও কৃষির চেয়ে বেশি ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় পাঁচ দশমিক ০৯ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছর সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও ২০২১-২২ অর্থবছর ছিল ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। এতে গত অর্থবছর চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে চার দশমিক ২২ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছর ছিল পাঁচ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাত দশমিক ১০ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছর ছয় দশমিক ৯৪ শতাংশ ও ২০১৯-২০ অর্থবছর তিন দশমিক ৪৫ শতাংশ।
শিল্প খাতের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল খাতে। এ খাতে ২০২২-২৩ অর্থবছর চার দশমিক ১৮ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি ছিল, যা গত অর্থবছর আরও কমে হয় পাঁচ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। অন্যান্য খনিজ ও কয়লা উৎপাদনে ২০২২-২৩ অর্থবছর রেকর্ড ১৭ দশমিক ০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও গত অর্থবছর তা কমে শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়। এছাড়া গ্যাস খাতে টানা দুই বছর ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকল। ২০২২-২৩ অর্থবছর এ খাতে এক দশমিক ৮৪ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি ছিল, যা গত অর্থবছর দাঁড়ায় এক দশমিক ৭৮ শতাংশ ঋণাত্মক। এছাড়া বিদ্যুৎ, পানি ও নির্মাণ তিন খাতেই প্রবৃদ্ধি কমেছে।
বিবিএসের তথ্যমতে, গত অর্থবছর বৃহৎ শিল্পে প্রবৃদ্ধির হার তলানিতে নেমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছর বৃহৎ শিল্পে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছর তা কমে দাঁড়িয়েছে আট দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর গত অর্থবছর তা আরও কমে দাঁড়ায় মাত্র এক দশমিক ০২ শতাংশ। একইভাবে কুটির শিল্পেও টানা দুই বছর সর্বনিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছর এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছর কুটিরশিল্পে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ০১ শতাংশ ও গত অর্থবছর ছয় দশমিক ৯২ শতাংশ।
এদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে দ্বিগুণ হলেও গত অর্থবছর তা আবার কমে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছর এ শিল্পে প্রবৃদ্ধির হার ছিল চার দশমিক ৮৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছর তা বেড়ে হয় ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছর কমে দাঁড়ায় ছয় দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর কৃষির মধ্যে শুধু মৎস্য উপখাতে প্রবৃদ্ধি অধিক হারে কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল দুই দশমিক ৮০ শতাংশ, যা গত অর্থবছর কমে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৭৯ শতাংশ।
সেবা খাতের মধ্যে আর্থিক ও বিমা খাতের প্রবৃদ্ধি ২০২২-২৩ অর্থবছর ছিল দুই দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছর কমে দাঁড়ায় এক দশমিক ২১ শতাংশ। পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা বিক্রি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, রিয়েল এস্টেট, পরিবহনসহ কয়েকটি খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। প্রসঙ্গত, গত অর্থবছর জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছর ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এছাড়া গত অর্থবছর জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের পরিমাণ সামান্য কমে দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছর ছিল ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ●
অকা/প্র/ই/ সকাল, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

