অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের শীর্ষ ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য শীর্ষ ১০০টি খেলাপি ঋণের মামলা বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বেশি অর্থ জড়িত—এমন ১০টি করে মামলার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এসব মামলায় আটকে থাকা ঋণের পরিমাণ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অর্থ উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর রোডম্যাপ তৈরির চিন্তাভাবনা চলছে। এ লক্ষ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইওদের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি চার দফায় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজারের বেশি মামলা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা। দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা এবং উচ্চ আদালতে বারবার রিট করায় এসব মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে।
এফআইডির সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, মামলাগুলো কেন নিষ্পত্তি হচ্ছে না এবং কীভাবে দ্রুত সমাধান পাওয়া সম্ভব—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, খেলাপিদের রিট করার আগে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা দেওয়ার বিধান রাখা হলে উচ্চ আদালতে রিটের প্রবণতা কমে আসবে এবং অগ্রিম কিছু অর্থও আদায় সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলো মামলা করলেও সেগুলো মাসের পর মাস শুনানির অপেক্ষায় থাকে। মামলায় গতি আনতে সরকারের আইনানুগ এখতিয়ার ব্যবহার করা হবে।
সূত্র জানায়, শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির মামলার মধ্যে জনতা ব্যাংকের ১০টি মামলায় খেলাপি ঋণের অঙ্ক ১৫,১৫১ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের ৫,৬৭৬ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৩,৯৮০ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৩,৭৪৮ কোটি, সাধারণ বীমা করপোরেশনের ৩,৭১৯ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ২,৪০০ কোটি এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১,৫৭৫ কোটি টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৮৭৬ কোটি, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ৮৬০ কোটি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২৯৪ কোটি এবং বিএসইসির ৮৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ মামলা রয়েছে।
পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, একটি মামলার বিপরীতে সর্বোচ্চ আটটি পর্যন্ত রিট করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচটি রিট করা হয়েছে। আবার অনেক মামলাই আদালতের শুনানির তালিকায় খুব নিচে থাকায় দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
এফআইডির যুগ্মসচিব ফরিদা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, বিভিন্ন ব্যাংক মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না এবং কোথায় সহায়তা প্রয়োজন তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলাগুলোর শুনানি তালিকা সামনের দিকে আনার চেষ্টা করা হবে।
সরকারের এ উদ্যোগ প্রসঙ্গে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. কামরুজ্জামান খান বলেন, “এফআইডি ব্যাংক খাতের কর্তৃপক্ষ। তারা সিদ্ধান্ত দিলে ব্যাংকগুলোর জন্য কাজ সহজ হয়, কারণ নিজ উদ্যোগে পদক্ষেপ নিতে গেলে অনুমতি নিতে হয়। এখন সে অনুমতির প্রয়োজন হবে না। শীর্ষ ১০টি মামলা নিয়ে মনিটরিংয়ের উদ্যোগ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মাহিন এন্টারপ্রাইজ (খেলাপি ঋণ ১,২৫১ কোটি টাকা), এফএমসি ডকইয়ার্ড লি. (১,১৭৫ কোটি টাকা), গ্লাক্সি সুয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লি. (১,১৪৬ কোটি টাকা), রিমেক্স ফুটওয়্যার লি. (১,০৮৪ কোটি টাকা), প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লি. (১,০৭১ কোটি টাকা) এবং মেরিন ভেজিটেবল অয়েল লি. (১,০৫৭ কোটি টাকা)।
অর্থ মন্ত্রণালয় আশা করছে, বিশেষ মনিটরিং ও কার্যকর রোডম্যাপের মাধ্যমে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে, যার ফলে আটকে থাকা কয়েক দশক পুরনো ঋণের একটি বড় অংশ ফেরত আনা যাবে। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 months আগে

