অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে আটকে আছে। প্রতিদিনকার নিত্যপণ্য কেনাকাটায় এ পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলছে স্বল্প আয়ের মানুষকে। রান্নাঘরের অপরিহার্য এই পণ্যটির দাম কেন কমছে না—এ নিয়েই বাজারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও রাজনৈতিক পরিসরে তীব্র আলোচনা চলছে।

সরকার বলছে, দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি একেবারেই উল্টো—তাদের মতে, সরবরাহ সংকুচিত থাকায় দাম কমার সুযোগ নেই। এর মধ্যে ভারতের পেঁয়াজ আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন জোটেনি। ফলে খুচরা পর্যায়ে দাম দীর্ঘ সময় ধরে শতক টাকার উপরে রয়ে গেছে।

রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, ছোট পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১০০ টাকা, মাঝারি ১১০ টাকা এবং বড় সাইজের পেঁয়াজ ১২০ টাকায়। গত তিন সপ্তাহ ধরে এই দামে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

মুগদায় পেঁয়াজ কিনতে আসা গৃহকর্মী রাবেকা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কম দামে কিছুই পাওয়া যায় না। দুই দিন পরপর একেকটার দাম বাড়ে। সরকার কেউ আমাদের হিসেব করে না—দাম বাড়লে কষ্ট আমাদেরই।”

ভারতের বাজারে এখন পেঁয়াজের দাম বাংলাদেশি হিসেবে কেজি ২৫–৩০ টাকার মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে—যা বাংলাদেশের দামের চার ভাগের এক ভাগ। দেশটি থেকে বাংলাদেশ, সৌদি আরবসহ বড় ক্রেতারা আমদানি বন্ধ রাখায় সেখানে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে স্থানীয় বাজারেও দাম তলানিতে নেমেছে।

এক সময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ছিল ভারত। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল—যা তাদের মোট রপ্তানির ৪২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন পেঁয়াজ কিনেছে। বিশেষজ্ঞদের মত, দীর্ঘ সময় রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভারত আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়েছে; ক্রেতারা বিকল্প উৎসে সরে গেছে।

দেশে পেঁয়াজের দামে ঊর্ধ্বগতি তৈরি হওয়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ বারবার সামনে আসে—উৎপাদন থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, মৌসুমের শেষভাগে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে মাঠ পর্যায়ে ক্ষতি। প্রতি বছর অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে এই চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, মৌসুম-নির্ভর এই কাঠামোগত সমস্যাকে কেন্দ্র করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ থাকে। তাই সরকারের উচিত বছরের শেষ চতুর্ভাগকে লক্ষ্য করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও সরবরাহ নিশ্চয়তার পরিকল্পনা নেওয়া।

গত বুধবার এক ব্রিফিংয়ে কৃষি উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই এবং আমদানি করলে স্থানীয় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাঁর মতে, গ্রীষ্মকালীন নতুন জাতের পেঁয়াজ বাজারে আসছে, সঙ্গে রয়েছে মুড়িকাটা পেঁয়াজ—যা সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখবে।

তিনি আরও বলেন, “কৃষক একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরের মৌসুমে উৎপাদনে আগ্রহ হারান। তাই আমদানি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষকের স্বার্থটাই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত।”
অকা/প্র/ই/সকাল/৩০ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version