অর্থকাগজ প্রতিবেদন>

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। নির্বাচনের ঠিক পাঁচ দিন পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। আজ ১৬ আগস্ট পূর্ণ হতে যাচ্ছে এই সরকারের দায়িত্ব পালনের ছয় মাস।

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় কী কী উদ্যোগ নিতে পেরেছে সরকার, এর মধ্যে তাদের অর্জনই বা কী, আর গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামীর চ্যালেঞ্জ কী— এসব তুলে ধরে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছে সরকার। সেখানে নানা বিষয়ে অবতারণার পাশাপাশি বলা হয়েছে, এই ৬ মাসে জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে সরকার।

প্রথম ছয় মাসের নিজস্ব মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি খুব শিগগিরই একটি বুকলেট আকারে প্রকাশ করবে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এটি প্রকাশ করতে পারেন।

সূত্র আরও জানায়, আগামী ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হবে।

সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জনকল্যাণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সংস্কার ও পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া এবং অর্জনের কথা আছে। এ ছাড়া, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষকদের কৃষি ঋণ মওকুফসহ আরও বেশ কয়েকটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করার সাফল্যের কথা থাকছে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, সরকার এই সময়ের মধ্যে কেবল নতুন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। ব্যক্তিনির্ভরতা পরিহার করে প্রাতিষ্ঠানিকতা প্রতিষ্ঠা করা, সরকারি খরচে মিতব্যয়িতা বজায় রাখা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার।

সরকারের ছয় মাসের রিপোর্টে সবচেয়ে দৃশ্যমান রাজনৈতিক বার্তাগুলোর একটি হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিকতার ওপর জোর দেওয়া। সরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে নেতাদের ছবি টানানোর প্রচলন বন্ধ করা, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার না করা এবং ভিআইপি সংস্কৃতি কমানো। একইসঙ্গে সরকারি ব্যয়ে সংযমের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন, কনভয়ের গাড়ির সংখ্যা কমানো হয়েছে এবং বিদেশ সফর ও সরকারি আপ্যায়ন ব্যয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাটছাঁটের কথা মূল্যায়ন রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তার মাসিক মূল বেতনের ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিচ্ছেন।

বর্তমান জাতীয় সংসদের ৫২টি কার্যদিবসে ১০৫টি বিল পাস করার বিষয়টিও মূল্যায়ন রিপোর্টে উঠে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১৭৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৬-৩১ মেয়াদে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের জিইডির প্রস্তাব অনুযায়ী দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে ৯৩ লাখ ২৭ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকার কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রীয় এজেন্ডা হিসেবে দেখছে। শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, অনানুষ্ঠানিক খাত, স্টার্টআপ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

অর্থনীতিকে সরকারের ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাগুলোর একটি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে ব্যবসা শুরুর সময় প্রায় এক বছর থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক অনুমোদনগুলো একীভূত করে ১২ মাসের প্রভিশনাল লাইসেন্স এবং ১৫তম দিনে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের অর্থায়ন সহজ করা এবং সবুজ বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ১৯ হাজার কোটি টাকার চারটি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে।

২০২৬ সালে সরকার প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে সরকারের প্রথম ৬ মাসে অর্থাৎ ১৮০ দিনে ২ কোটি ২২ লাখ ৬৮ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সামনে আনা হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

বিএনপির অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ফ্যামিলি কার্ড চালু করা। বিগত ৬ মাসে সরকার ৬৭ হাজার ২৭৮টি কার্ড বিতরণ করেছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে অন্তত ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সরকারের প্রথম ছয় মাসের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে সম্পন্ন হওয়ার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর বড় অভিযানকে ‘রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার।

‘কৌশলগত ভারসাম্য’ এবং ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’, এই নীতিকে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার কথা বলেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জুনের চীন সফরকে ছয় মাসের অন্যতম বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই সফরে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের ভাতা বাড়ানো হয়েছে। ১৪ হাজার ৩৬৮ জন গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ১৩ হাজার ৪৭৯ জন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন।

তবে, এই ছয় মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মার্চ ও এপ্রিলে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির পর জুলাইয়ে গ্যাস সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এমনকি কিছু শিল্প কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়।

Leave A Reply

Exit mobile version