অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বৈশ্বিক বাণিজ্যে চলমান অস্থিরতা, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের গ্যাস–বিদ্যুতের সংকট মিলিয়ে বাংলাদেশের রফতানি খাত ক্রমেই চাপে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে। টানা পাঁচ মাস ধরে রফতানি আয় নিম্নমুখী থাকায় সার্বিক অর্থনীতিতে সতর্কতার বার্তা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়কালে রফতানি আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। যদিও একই সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, ফলে চাহিদার তুলনায় ডলারের জোগান তুলনামূলক বেশি রয়েছে। তবুও রফতানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সামগ্রিক প্রবাহ কিছুটা শ্লথ হয়েছে। এর ফল হিসেবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে আবারও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে ডলারের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণেই রফতানি আয়ের সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে এখনই সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি মূলত ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে হয়ে থাকে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই এ খাতে এলসি খোলার পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। আগের অর্থবছরে খোলা এলসির আওতায় কাঁচামাল দেশে আসায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রফতানি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল। তবে অক্টোবর থেকে সেই প্রবণতা উল্টো হয়ে যায়। চলতি অর্থবছরের জুলাই–নভেম্বর সময়ে ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা কমেছে ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং একই সময়ে আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এর বিপরীতে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রফতানি শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছিল ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছিল ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করলে রফতানি খাতে মন্দার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি শিল্পের কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি; বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দাম স্থিতিশীল রয়েছে। তবুও রফতানি আদেশ কম আসায় উদ্যোক্তারা নতুন করে কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর ফলে কাঁচামালের আমদানিও কমছে, যা আগামী মাসগুলোতে রফতানি আয় আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই মাসে রফতানি আয় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু এরপর থেকেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। আগস্ট থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস রফতানি আয় কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে মোট রফতানি আয় কমেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, গত আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে রফতানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ, অক্টোবরে ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং নভেম্বরে ২ শতাংশ। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ডিসেম্বরে—গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি ডিসেম্বরে রফতানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। যদিও নভেম্বরে তুলনায় ডিসেম্বরে আয় সামান্য ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেড়েছে, তবুও সামগ্রিক প্রবণতা নেতিবাচকই রয়ে গেছে।
রফতানি আয় বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিয়েছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশে আটকে থাকা রফতানি আয়ের ডলার দেশে আনার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় ও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কিছু রফতানি আয় দেশে ফিরেছে এবং গত সেপ্টেম্বর থেকে রফতানি আয়ে সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এদিকে রফতানি আদেশ পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া আগাম পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় কমতে পারে। ডিসেম্বর মাসে এ খাতে আমদানি দায় প্রায় ৯৭ কোটি ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়াতে পারে ৮২ কোটি ৯২ লাখ ডলারে।
বর্তমানে রফতানি আয় কমলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় ডলারের বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব এখনো দেখা যায়নি। তবে দীর্ঘ সময় ধরে রফতানি আয় নিম্নমুখী থাকলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন আমদানি বাড়বে, সঙ্গে বাড়বে ডলারের চাহিদা ও ব্যয়। সে সময় রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রফতানি আয় বাড়ানো সম্ভব না হলে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি আরও গভীর হতে পারে।
অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘদিন চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল, যার ফলেই ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলেই এই হিসাবে ঘাটতি তৈরি হয়, আর ব্যয় কম হলে উদ্বৃত্ত দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় পর গত অর্থবছরে এ হিসাবে ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্তও উদ্বৃত্ত বজায় ছিল। কিন্তু রফতানি আয় কমে যাওয়ায় অক্টোবর থেকে আবার ঘাটতি শুরু হয় এবং জুলাই–নভেম্বর সময়ে এই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি ডলারে।
রফতানি আয় আরও কমতে থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়বে তৈরি পোশাকসহ রফতানিমুখী শিল্পে। অনেক কারখানাই তখন স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারবে না, উদ্যোক্তাদের তারল্য সংকট বাড়বে এবং কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ইতোমধ্যেই কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি—সব মিলিয়ে রফতানি খাতের ওপর চাপ বাড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য স্পষ্ট সতর্ক সংকেত। ●
অকা/প্র/ই/দুপুর/২৫ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 days আগে

