অর্থকাগজ প্রতিবেদন>
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই অর্থায়ন বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এ খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে পরিবেশবান্ধব (সবুজ) প্রকল্প এবং টেকসই কৃষি খাতে অর্থায়ন কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ সাসটেইনেবল ফিন্যান্স প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৩ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে এ খাতে অর্থায়ন বেড়েছে ১৪ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের পরিমাণ ৯৭ হাজার ৫৫৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) অর্থায়ন ২ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই অর্থায়নের গুরুত্ব বাড়ছে। এ কারণে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই), পরিবেশবান্ধব শিল্প, সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ ব্যবসা এবং জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ বিতরণে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
সবুজ অর্থায়নে ভাটা
টেকসই অর্থায়ন বাড়লেও পরিবেশবান্ধব বা সবুজ প্রকল্পে ঋণ বিতরণ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৯৬ কোটি ৭ লাখ টাকা। তিন মাস আগে, অর্থাৎ ডিসেম্বর শেষে এই খাতে অর্থায়ন ছিল ৬ হাজার ৯৮০ কোটি ৭ লাখ টাকা। ফলে এক প্রান্তিকেই সবুজ অর্থায়ন কমেছে প্রায় ১ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা।
সবুজ অর্থায়নের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি), পরিবেশবান্ধব ইটভাটা, জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হয়।
মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৬২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন ছিল ৫৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা।
কৃষিতেও কমেছে অর্থায়ন
টেকসই কৃষি খাতেও ঋণ বিতরণ কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে এ খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট অর্থায়ন দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২২৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যার পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬২৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে টেকসই কৃষিতে অর্থায়ন কমেছে ২ হাজার ৩৯৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফিন্যান্স নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ১১টি ক্যাটাগরির আওতায় ৬৮ ধরনের টেকসই পণ্যে অর্থায়ন করতে পারে। এর মধ্যে কৃষি, সিএমএসএমই, পরিবেশবান্ধব শিল্প, সামাজিক প্রভাবভিত্তিক প্রকল্প এবং সবুজ প্রযুক্তি অন্যতম।
নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে মোট ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ টেকসই খাতে এবং ৫ শতাংশ পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রকল্পে বিতরণের লক্ষ্য পূরণ করতে হয়।
এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই অর্থায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত সাসটেইনেবল রেটিং প্রকাশ করে।
কেন বাড়ছে টেকসই অর্থায়ন
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ড পূরণের প্রয়োজনীয়তার কারণে টেকসই অর্থায়নের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প, কৃষি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে।
তবে তাদের মতে, টেকসই অর্থায়নের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও সবুজ অর্থায়নের নিম্নমুখী প্রবণতা উদ্বেগের বিষয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ না বাড়লে জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, টেকসই অর্থায়নের পাশাপাশি সবুজ অর্থায়নেও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এতে একদিকে পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।

