ঝুমি পাল 

চাকরি পাব তো? ভবিষ্যতে কী করব? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ বা তরুণীর কাছে এটা খুবই স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন। তাই স্কুল শিক্ষার্থীদের উচিত এখন থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাদের ভিত্তিকে মজবুত করা। একজন শিক্ষার্থীর গতানুগতিক কর্মকাণ্ড খুবই চেনা। সকালের সংকেত, তাড়াহুড়ো করে কোচিং, তারপর স্কুল, বিকেলে আবার গৃহশিক্ষক, আর রাতে টেবিলে বসে গাদা গাদা গাণিতিক সূত্র বা পাঠ্য বইয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি  মুখস্থ করা। লক্ষ্য একটাই যে পরীক্ষায় 'এ প্লাস' পেতে হবে, একটা ভালো সনদের জোরে ভবিষ্যতে একটু ভালো উপার্জন করা যাবে!

কিন্তু একটু বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ভাবো তো, বিজ্ঞান কি আসলেই শুধু কয়েকটা সমীকরণ, মোটা মোটা বইয়ের পাতা আর একটা ভালো চাকরির আশায় বন্দি কোনো খাঁচা? একদমই না। বিজ্ঞান যেমন একদিকে তোমার চোখকে একটা জাদুকরী চশমা এনে দেয়, ঠিক তেমনি  পকেটে এনে দেয় আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাবিকাঠি। বিজ্ঞান কেবল বইয়ের পাতায় কিছু জটিল তত্ত্ব বা গবেষণাগারের পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়,এটি আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষার্থীদেরকে যদি ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার জগতটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়,তবে তারা শুধু বিজ্ঞানের মজা উপভোগ করবে না, বরং তাদের মনে নতুন কিছু উদ্ভাবনের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তৈরি হবে। ক্ষুদে এই উদ্ভাবকরা যখন বড় হয়ে নতুন প্রযুক্তি ও সমাধান আবিষ্কার করবে, তখন তা আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য ও শিল্প ক্ষেত্রে অভাবনীয় গতি আনবে যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চাকাকে আরো সমৃদ্ধ করবে।

বিজ্ঞানের অনুভূতি

আমরা যখন পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করি যে, আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার, তখন তা কেবলই একটা সংখ্যা। কিন্তু চোখ বন্ধ করে একবার ভেবে দেখেছ? তুমি যদি আলোর বেগে ছুটতে পারতে, তবে মাত্র ১ সেকেন্ডে পুরো পৃথিবীকে সাড়ে সাত বার চক্কর দিয়ে আসতে পারতে!

পাঠ্য বই আমাদের শেখায় মহাকর্ষের সূত্র। কিন্তু বিজ্ঞান আমাদের ভাবায়—যদি একটা ব্ল্যাকহোলের কাছে তুমি চলে যাও, তবে তোমার সময়ের গতি ধীর হয়ে যাবে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের এই বিস্ময়কর ঘটনাটি মহাকাশ বিজ্ঞানে 'মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণ' (Gravitational Time Dilation) নামে পরিচিত, যা প্রমাণ করে মহাবিশ্বে সময় সবার জন্য সমান নয়।

হলিউডের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীভিত্তিক সিনেমা ইন্টারস্টেলারের (Interstellar) কথা ভাবা যাক। সিনেমায় নভোচারী কুপার 'গারগানচুয়া' নামের একটি বিশাল ব্ল্যাক হোলের খুব কাছে অবস্থিত 'মিলার্স প্ল্যানেট' নামের  একটি গ্রহে অবতরণ করেন। ব্ল্যাক হোলের তীব্র মহাকর্ষের কারণে ওই গ্রহটিতে কাটানো মাত্র ১টি ঘণ্টা ছিল পৃথিবীর ৭ বছরের সমান! কুপার যখন সেই গ্রহে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে মূল মহাকাশযানে ফিরে আসেন, ততক্ষণে পৃথিবীতে অনেক বছর পার হয়ে গেছে। সিনেমার শেষে কুপার যখন পৃথিবীতে ফেরেন, দেখেন তাঁর ফেলে যাওয়া ছোট্ট ১০ বছরের মেয়েটি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, অথচ কুপারের বয়স কিন্তু একটুও বাড়েনি! তীব্র মহাকর্ষ কীভাবে সময়কে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে, ইন্টারস্টেলার সিনেমাটি আমাদের সেটাই নিখুঁতভাবে দেখিয়েছে।

বিজ্ঞান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই ব্ল্যাকহোল আর আলোর বেগ দিয়ে বাস্তব জীবনে কী হবে? এখানেই আসে বিজ্ঞানের দ্বিতীয় রূপ যা হচ্ছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষগুলোর দিকে তাকাও; ইলন মাস্ক, বিল গেটস বা জেফ বেজোস এরা কেউই মুখস্থ বিদ্যার জোরে এখানে আসেননি। তাঁরা বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে ব্যবসা ও অর্থনীতি বদলে দিয়েছেন। বিজ্ঞান জানা মানে শুধু ল্যাবে বসে গবেষণা করা নয়। তুমি যদি কোডিং, ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কিংবা বায়োটেকনোলজির মৌলিক বিজ্ঞানটা মন থেকে বোঝো, তবে পুরো পৃথিবীর গ্লোবাল মার্কেট তোমার হাতের মুঠোয়। ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং বা রিমোট জবের মাধ্যমে তুমি বিদেশি মুদ্রা আয় করতে পারো।

আজ যে দেশ বিজ্ঞানে যত উন্নত, সে দেশের অর্থনীতি তত শক্তিশালী। সিলিকন ভ্যালির ট্রিলিয়ন ডলারের আইটি ইন্ডাস্ট্রি কিংবা জার্মানির রোবোটিক্স ও অটোমোবাইল শিল্প সবই গড়ে উঠেছে বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে। আমাদের দেশকেও যদি আমরা পোশাক শিল্পের বাইরে গিয়ে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, সফটওয়্যার এক্সপোর্ট আর ন্যানোটেকনোলজির মতো হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিতে এগিয়ে নিতে চাই, তবে আমাদের বিজ্ঞানকে মুখস্থ নয়, ধারণ করতে হবে। বিজ্ঞানই পারে আমাদের মাথা পিছু আয় বাড়িয়ে দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে।

 বিজ্ঞান কোনো পাঠ্যতালিকা নয়, তা চিন্তাশক্তির প্রসার 

আমাদের মনে হতে পারে, বইয়ে যা লেখা আছে সেটুকুই বিজ্ঞান। অথচ সত্যিটা হলো, বইয়ের বাইরে অজানার যে মহাসমুদ্র, সেটাই আসল বিজ্ঞান।
 তোমার ঘরের কোণের মাকড়সাটা কীভাবে জ্যামিতিক নিখুঁত জাল বোনে?
 বর্ষাকালে ব্যাঙগুলো কীভাবে বোঝে যে এখন গান গাওয়ার সময় হয়েছে?
 দূর আকাশের যে তারার আলো দেখে তুমি মুগ্ধ হচ্ছো, সেই তারাটি হয়তো লাখো বছর আগেই মরে গেছে, শুধু তার আলো এতদিনে তোমার চোখে এসে পৌঁছাল!
বিজ্ঞান তোমাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। নিউটন যদি শুধু ভাবতেন -আপেল তো নিচেই পড়ে, এটা মুখস্থ করে রাখি! তবে আজ আমরা কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাতে পারতাম না, আর উপগ্রহ না থাকলে আজকের এই ইন্টারনেট বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিও সচল হতো না! তাই বিজ্ঞানকে মন থেকে ধারণ করতে হবে। প্রশ্ন করো - কেন হলো এবং কীভাবে হলো?

বৃত্তের বাইরে পা রাখার উপায়

পরীক্ষার পড়া অবশ্যই পড়বে, কিন্তু তার পাশাপাশি বিজ্ঞানের আসল স্বাদ পেতে এবং নিজেকে ভবিষ্যতের বিশ্ব বাণিজ্য বাজারের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে এ কাজগুলো করতে পারো।

১। বিজ্ঞানের জনপ্রিয় কিছু বই পড়ো যেগুলো তোমার ভাবনার দিগন্ত খুলে দেবে।

২। প্রামাণ্য (ডকুমেন্টরি) চিত্র দেখো, অবসর সময়ে Cosmos, Our Planet বা বিভিন্ন সায়েন্স চ্যানেলের ভিডিও দেখতে পারো। ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যপট মানুষের কল্পনাশক্তিকে দারুণভাবে বাড়িয়ে দেয়।

পাঠ্য বইয়ের অন্তর্ভুক্ত নতুন কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হলে শিক্ষার্থীরা শুরুতেই সহায়ক বইয়ের সাহায্য নেয় যা তাদের চিন্তা শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। তাই শুরুতেই কোনো কিছুর সাহায্য না নিয়ে তাদের এ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।

অন্যদের থেকে এগিয়ে নিতে যা যা করণীয়

বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, গণিত অলিম্পিয়াড, ফিজিক্স অলিম্পিয়াড, বায়োলজি অলিম্পিয়াড, কেমিস্ট্রি অলিম্পিয়াড, ন্যাশনাল স্টিম অলিম্পিয়াড এবং চিলড্রেন সায়েন্স কংগ্রেসসহ বিজ্ঞান সম্পর্কিত সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা আমাদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিভাকে আরো উন্মোচন করতে পারি। অলিম্পিয়াডগুলোর এই সনদ কিন্তু পরে বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি বা স্কলারশিপ পেতে এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়তে দারুণ সাহায্য করে।

বিজ্ঞানকে আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করার জন্য বিজ্ঞানচিন্তা মাসিক ম্যাগাজিন দারুণ একটা পছন্দ!

তুমিই  আগামী দিনের বিজ্ঞানী

আজ যে ছেলে বা মেয়েটি শ্রেণিকক্ষে বসে ব্ল্যাকবোর্ডের বাইরেও জানালা দিয়ে তাকিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়া দেখছে আর ভাবছে মেঘ কীভাবে তৈরি হয় বা পাখির উড়ার পেছনের বিজ্ঞান কী , সেই আগামী দিনের বিজ্ঞানী। জিপিএ সনদের বৃত্তে নিজের কল্পনাকে আটকে রেখো না। বিজ্ঞান কোনো ভয়ের বিষয় নয়; বিজ্ঞান হলো আনন্দ, বিজ্ঞান হলো এক চিরন্তন অ্যাডভেঞ্চার এবং তোমার স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত হাতিয়ার। বইয়ের পাতা ওল্টাও, তবে চোখ দুটো খোলা রাখো মহাবিশ্বের দিকে!

মতামত লেখকের নিজস্ব

লেখক হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী
jumirani2005@gmail.com

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version