হিমাদ্রিশেখর সরকার
আমাদের দেশে মাঠ পর্যায়ে প্রধানত সরকারি মালিকাধীন ব্যাংকগুলো কৃষিঋণ বিতরণ করে থাকে। বলা হয় তারা ‘সহজশর্তে’ এ ঋণ কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে থাকে। কিন্তু ‘সহজশর্ত’ কতটা ‘সহজ’ তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। এ বিষয়ে যাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে কিংবা যারা ভুক্তভোগী একমাত্র তারাই বিষয়টি খোলাসা করতে পারে।
যাক, এখানে আমরা আলোচনা করছি কৃষি ঋণের সময়মতো প্রাপ্যতার বিষয়টি। অর্থাৎ সরকারি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে কৃষিঋণ বিতরণ করে থাকে তা কী সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছায়? সঠিক সময়ে ঋণটি কৃষকের হাতে গেল কিনা তা তদারকি করার কোন প্রতিষ্ঠান সরকারের আছে কী? সরকারের হয়ে মাঠপর্যায়ে যারা কৃষি ঋণ দেয় তাদের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে ‘বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক’, যাকে সংক্ষেপে ‘বিকেবি’ বলা হয়। তারই আরেকটি ‘বিচ্ছিন্ন্ অংশ’ আছে যাকে ‘রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক’ বা সংক্ষেপে ‘রাকাব’ বলা হয়। এটির কার্যক্রম শুধু রাজশাহী বিভাগেই সীমাবদ্ধ। এছাড়াও আছে ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড’ বা ‘বিআরডিবি’। পাশাপাশি সরকারি মালিকাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও উত্তরা ব্যাংক তো আছেই। তবে তাদের কৃষি ঋণ বিতরণের হার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেকটাই কম। আর তাদের শাখাও গ্রামে-গঞ্জে তেমন নেই। আমাদের যেসব বেসরকারি ব্যাংক আছে তাদের কৃষি ঋণ বিতরণের হার নামমাত্র। এক্ষেত্রে তারা সরকারি আদেশ-নির্দেশের খুব একটা তোয়াক্কাও করে বলে মনে হয় না।
এখন প্রশ্নœ আসবে কৃষি ঋণ বলতে আমরা কোন ধরণের ঋণকে বুঝবো? শস্য উৎপাদন, মৎস্য চাষ এবং পশুপালন খাতে যে সকল ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয় তাকেই আমরা এখানে কৃষি ঋণের সংজ্ঞা বলব। কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র যে শিল্প ঋণ এটা তার আওতাভূক্ত করা যেতে পারে।
আমাদের দেশে শস্য উৎপাদন খাতে যে কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয় তা অনেকটাই ঋতুভিত্তিক। যেমন, শীতকালে শীতকালীন সব্জি চাষ, বোরো ধান ও গম চাষের জন্য ঋণ দেয়া হয়। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে আউশ, আমন, পাট ইত্যাদি চাষের জন্যও ঋণ বিতরণ করা হয়। ব্যাংকের সার্কুলারেও এই রকমটাই লেখা থাকে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এর ব্যতিক্রম দেখে থাকি। দেখা গেলো বোরোর আবাদ শুরু হয়ে যাওয়ার পরও বা সময় পার হয়ে গেলেও কৃষকের হাতে বোরো চাষের ঋণ পৌঁছে না। যখন পৌছায় তখন সে টাকা চাষাবাদের কাজে লাগে না। বরং তা ব্যক্তি ভোগে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া কৃষককে এ টাকা পেতে ঋণদাতাকে উৎকোচও দিতে হয় তাও বাস্তবতা! ব্যাংকের বিবিধ নিয়মাচার পালন করতে করতে কৃষক যখন ক্লান্ত ও তিক্ত-বিরক্ত তখন হয়তো দেখা যায় কৃষকের হাতে ঋণের টাকা পৌঁছে। কিংবা এ টাকা তিনি যে কাজের জন্য ঋণ করেছেন দেখা যায় আদৌ ওই টাকা তার সে খাতে খরচ হচ্ছে না বা তিনি খরচ করতে পারেননি। জমিতে জল সেচ, সার বা নিড়ানি দেওয়া ইত্যাদি কাজ তো আর থামিয়ে রাখা যায় না। কৃষি ক্ষেত্রেও সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে কৃষক অন্য উৎস থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। যার সুদের হার সরকারি কৃষি ঋণের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে থাকে। এটি মহাজনী ঋণ বা এনজিও ঋণ। যার পরিশোধের শর্তও থাকে অনেক কঠিন ও নির্মম। সরকারি ব্যাংক থেকে সঠিক সময়ে ঋণ না পাওয়ার কারণে কৃষক অধিক হারে অর্থাৎ দুদিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। আমরা এখানে উদাহরণস্বরূপ একটি ফসলের কথা বললাম। বাস্তবে প্রায় ক্ষেত্রেই ঋণ বিতরণের অলিখিত এ অনিয়ম দেখা যায়। যার প্রতিকার কৃষকের হাতে নেই। তা সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে।
আমাদের সরকারি ঋণদান সংস্থাগুলো এখনো এ বিষয়ে পেশাদারি মনোভাব প্রদর্শন করছে না। তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ ও আদায়ে একধরণের দায়সারা ভাব পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য তাদের লোকবলের অভাবের বিষয়টাও বিবেচনায় নিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক ঋণটি যদি সঠিক খাতে বিতরণ হয় আর কৃষক যদি সঠিক খাতে ঋণটির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেন এতে তারা যে লাভবান হবেন একথা নির্ধিদ্বায় বলা যায়। সংশ্লিষ্ট ঋণদান সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ঋণ বিতরণে সচেতন থাকে তবে দেশের কৃষকরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন থেকে রেহাই পান। দেশের সিংহভাগ মানুষের বেঁচে থাকা যেহেতু কৃষির ওপর এখনো নির্ভরশীল তাই কৃষিকে বঁাঁচাতে হবে। আর এর জন্য কৃষককে সঠিক সময়ে সঠিক ঋণ বিতরণ করতে হবে। তবেই দেশ বাঁচবে।

লেখক প্রাবন্ধিক ও সাবেক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা
shekhorhimadri@gmail.com
অকা/কৃশি/নিলে/সৈইহো/বিকেল/২৯ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 11 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version